ফের যুদ্ধের জন্য ইরান প্রস্তুত, তবে কূটনীতির পথও খোলা: আরাগচি

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজে কথা বলছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ আবারও শুরু হলে ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, কূটনীতির পথ এখনো বন্ধ করেনি তেহরান।
স্থানীয় সময় রবিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি এসব কথা বলেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আবার ইরানে হামলা চালাতে পারে— এমন প্রতিবেদনের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরান তার জন্য প্রস্তুত। একই সঙ্গে শান্তির সুযোগ নষ্ট না করতে কূটনীতির চেষ্টাও চালিয়ে যাবেন তিনি।
আরাগচি বলেছেন, ‘যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার সময়ের জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। নতুন যেকোনো আগ্রাসনের মুখে আমরা দৃঢ় থাকব, এমনকি তা সর্বনাশা যুদ্ধের দিকে গেলেও। একই সময়ে আমরা কূটনীতির জন্যও প্রস্তুত। এখন সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের।’
এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল আবার চালুর একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দিয়েছিল। কাতারের মধ্যস্থতায় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে নিউ ইয়র্কে ওই প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, চুক্তির অংশ হিসেবে সাত দিনের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল চালুর কথা ছিল।
তবে ট্রাম্প শনিবার জানিয়েছেন, তিনি ইরানের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান ‘খুব খারাপভাবে হারছে’ বলেই দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে চুক্তি করতে চাইছে।
আরাগচি অবশ্য বলেছেন, ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা বললেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে তা জানানো হয়নি। তাই তেহরান এখনো কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরান প্রস্তুত। এর বিনিময়ে তেহরান চায়, বিদেশে আটকে থাকা তার অর্থ ও সম্পদ ছাড় করা হোক এবং ইরানকে আবার তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া হোক।
আরাগচির ভাষ্য, এসব শর্ত নতুন নয়। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতাতেও এ ধরনের বিষয় ছিল। ওই সমঝোতার ভিত্তিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার পর তা ভেঙে যায়।
আরাগচি বলেছেন, ‘আপনি যদি আমাদের জিজ্ঞেস করেন, কূটনীতিতে ফিরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমি এখনো কূটনীতির চেষ্টা করছি। কারণ শান্তির কোনো সুযোগই আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়।’
তিনি আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরানের কোনো আগ্রহ নেই। ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ভাবি না। আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ নিয়ে ভাবি,’ বলেছেন তিনি।
‘যুদ্ধ বিক্রি করতে নিউ ইয়র্কে আসিনি’
এদিকে সাক্ষাৎকারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরাগচি লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তিনি ‘যুদ্ধ বিক্রি করতে’ নিউ ইয়র্কে যাননি। তারা শান্তির পথ তৈরি করতে এসেছেন।
আরাগচি লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং আমি যুদ্ধ বিক্রি করতে নিউ ইয়র্কে আসিনি। আমরা শান্তি গড়তে এসেছি।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘তারপরও ইরান যেকোনো আগ্রাসনের মুখে দৃঢ় থাকবে— এমনকি তা সর্বনাশা যুদ্ধের দিকে গেলেও। একই সময়ে আমরা প্রকৃত কূটনীতির জন্য প্রস্তুত।’
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
আরাগচির সাক্ষাৎকারের আগে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ একই অনুষ্ঠানে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এর পেছনে ‘বেশ কয়েকটি কারণ’ রয়েছে।
ওয়াল্টজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বিদেশে আটকে থাকা ‘কয়েক বিলিয়ন ডলার’ অর্থে প্রবেশাধিকার দিতে পারে না। তার দাবি, ইরানের প্রস্তাবের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ তুলে নেওয়ার পাশাপাশি বিপুল অর্থে প্রবেশাধিকারের বিষয়টি রাখা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেছেন, ইরান আগের সমঝোতা লঙ্ঘন করে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে হামলা চালিয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে। একই সঙ্গে ওয়াল্টজ প্রশ্ন তুলেছেন, এ মুহূর্তে ইরানে আসলে কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
ওয়াল্টজ বলেছেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন সব ধরনের পথ খোলা রাখবে। তবে ট্রাম্প কী ধরনের চুক্তি মেনে নেবেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলেননি।
ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছিলেন, ইরানকে ‘ধ্বংস’ করার পথে যাওয়া হবে, নাকি চুক্তি করা হবে— সে সিদ্ধান্ত এখনো বিবেচনায় রয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে।
তবে ইরান জানিয়েছে, তাদের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের সময়সূচির ওপর নির্ভর করছে না। আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরান একই সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি রাখছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগও খোলা রাখছে।
সূত্র : এনবিসি নিউজ




