হরমুজের আগুনে দিল্লির কূটনীতি
ব্রিকস থেকে কী নিয়ে ফিরল ইরান-সৌদি-আমিরাত
- ইরান পেল কূটনৈতিক ঢাল, আমিরাত পেল সংলাপের দরজা, সৌদির হাতে নতুন ভারসাম্য
- ব্রিকস শেষে বদলেছে কি মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ?

ব্রিকস সম্মেলনে তেহরান রাজনৈতিক সমর্থনের ভাষা পেয়েছে, কিন্তু সামরিক বা কৌশলগত নিশ্চয়তা পায়নি।
দুই দিন আগে প্রশ্ন ছিল, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কি একই মঞ্চে থেকেও এক ভাষায় কথা বলতে পারবে? রবিবার নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন শেষ হওয়ার পর উত্তরটি পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ নয়, আবার ‘না’-ও নয়। বরং যুদ্ধের উত্তাপ, হরমুজের অনিশ্চয়তা, সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেও তিন পক্ষ এমন একটি ন্যূনতম কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছে, যা সম্মেলনের আগে সহজ মনে হয়নি।
শনিবার গৃহীত ‘নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন’-এ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় “গভীর উদ্বেগ” জানিয়ে সর্বোচ্চ সংযম, সংলাপ, কূটনীতি এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনহীন একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কবাধার সমালোচনা করা হয়েছে। ইরানের জন্য এটি ছিল বড় কূটনৈতিক প্রাপ্তি। কারণ ঘোষণাপত্রে কোনও দেশকে সরাসরি অভিযুক্ত না করেও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা, বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা তেহরানের বহুদিনের অভিযোগের সঙ্গে মিলে যায়।
তবে ইরান সবটুকু পায়নি। ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম নিয়ে তীব্র নিন্দা জানায়নি, যুদ্ধ বন্ধের কোনও নির্দিষ্ট রূপরেখাও দেয়নি। ফলে তেহরান রাজনৈতিক সমর্থনের ভাষা পেয়েছে, কিন্তু সামরিক বা কৌশলগত নিশ্চয়তা পায়নি। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মোদীর সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক শান্তি, নৌচলাচলের স্বাধীনতা ও বাণিজ্যপথ নিরাপদ রাখার প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা করেছেন। এটি দেখিয়েছে, ভারত ইরানের পাশে যোগাযোগের দরজা খোলা রাখলেও নিজেকে যুদ্ধের পক্ষ নয়, মধ্যস্থতামুখী শক্তি হিসেবে রাখতে চায়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ইরান-আমিরাত সম্পর্কে। আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ও পেজেশকিয়ানের বৈঠক ছিল সংঘাত শুরুর পর দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ। তাঁরা উত্তেজনা কমানো, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তি ও উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেন। পরে ইরানি পক্ষ জানায়, অতীতের বিরোধ পেছনে ফেলে সামনে এগোনোর বিষয়ে দুই পক্ষের ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। ইউএইর জন্য এটাই সবচেয়ে বড় লাভ, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করেও নিজের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার একটি সরাসরি চ্যানেল।
সৌদি আরবের হিসাব কিছুটা আলাদা। রিয়াদ এখনও ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়; সম্মেলনে যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আমন্ত্রিত দেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। তবু সৌদির জন্য দিল্লির বার্তা গুরুত্বপূর্ণ। ইরাক থেকে ড্রোন হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ এবং হুথিদের নতুন হামলার মধ্যে রিয়াদের প্রধান স্বার্থ এখন আঞ্চলিক স্থিতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিকল্প রপ্তানি পথ সচল রাখা। ব্রিকসের সংযম ও নিরাপদ বাণিজ্যপথের ভাষা সেই স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থনৈতিক দিকেও তিন পক্ষের জন্য জায়গা তৈরি হয়েছে। ঘোষণাপত্রে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট, জ্বালানি সহযোগিতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞায় চাপে থাকা ইরানের জন্য এসব বিকল্প আর্থিক পথ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ; ইউএইর জন্য তা তার আর্থিক কেন্দ্র ও বাণিজ্য হাবের ভূমিকা বাড়ানোর সুযোগ; আর সৌদির জন্য বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের আরেকটি মঞ্চ। তবে এগুলো তাৎক্ষণিক চুক্তি নয়, বরং ভবিষ্যৎ দরকষাকষির কাঠামো।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও এই সমঝোতার মূল্য আছে। হরমুজ বা লোহিত সাগরে উত্তেজনা কমলে তেল, এলএনজি, জাহাজভাড়া ও আমদানি ব্যয়ের চাপ কমতে পারে; উল্টো সংঘাত বাড়লে দিল্লির কূটনৈতিক ভাষা দ্রুতই বাস্তব পরীক্ষায় পড়বে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।
চীন ও রাশিয়াও এই সমঝোতা থেকে লাভবান। শি জিনপিং ‘গ্রেটার ব্রিকস’-এর অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছেন; পুতিন এটিকে আরও ন্যায্য বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু দিল্লির সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল বিরোধী স্বার্থের দেশগুলোকে একই ঘোষণায় স্বাক্ষর করানো। গত মে মাসে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক যৌথ বিবৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছিল; এবার সেই বাধা পেরোনো হয়েছে।
তবু উচ্ছ্বাসের আগে সতর্কতা জরুরি। ইরান-ইউএই বৈঠক যুদ্ধ থামায়নি, সৌদি-ইরান আস্থার ঘাটতিও দূর হয়নি। হরমুজ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ, তেলের বাজার অস্থির, আর উপসাগরে হামলা অব্যাহত। ব্রিকস তাই কোনও শান্তিচুক্তি দেয়নি; দিয়েছে কথোপকথনের একটি ছাতা।
দিল্লির সম্মেলন শেষে তিন দেশের হিসাব তাই তিন রকম: ইরান পেল নিষেধাজ্ঞা-বিরোধী কূটনৈতিক ভাষা, ইউএই পেল তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের পথ, আর সৌদি পেল নিজের নিরাপত্তা ও জ্বালানি উদ্বেগকে বৃহত্তর বহুপাক্ষিক আলোচনায় তোলার সুযোগ। ছবিতে ঐক্য ছিল; বাস্তবে দূরত্ব রয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের সময়েও যদি প্রতিদ্বন্দ্বীরা একই টেবিলে বসে ভাষা খুঁজে নিতে পারে, ব্রিকসের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আপাতত সেটিই।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক



