শেখ হামাদকে কীভাবে মনে রাখবে কাতার?

ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে শেখ হামাদ
৭৪ বছরে থামলেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। আধুনিক কাতারের রূপকার। দীর্ঘ ১৮ বছর শাসন করেছিলেন উপসাগরীয় রাষ্ট্রটি। প্রায় ২৫ লাখ মানুষের ছোট্ট দেশটির জিডিপি ২৪ গুণেরও বেশি বেড়েছিল তার সময়ে।
দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদ কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমূল বদল ঘটিয়েছিল তার নেতৃত্ব, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কাতারের মর্যাদা বাড়িয়েছিল বহুগুণ।
আমিরের কার্যালয় বা আমিরি দিওয়ান বলছে, তার শাসনামলে ২০০৬ সালের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয় কাতার। ২০১০ সালে এর উৎপাদন ক্ষমতা পৌঁছায় বার্ষিক ৭৭ মিলিয়ন টনে, যা বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের ২০ শতাংশ।
শেখ হামাদ কাতারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও গণমাধ্যম খাত পুনর্গঠনে বিপুল বিনিয়োগ করেছিলেন। ক্ষমতা নেওয়ার পরের বছরই প্রতিষ্ঠা করেন ‘আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক’, যা এখন প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা জানতে বিশ্ব জুড়ে অনেক দর্শক-পাঠক নির্ভর করেন আল জাজিরার ওপর। শেখ হামাদ এই গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন বহু আগেই।
কাতার ফাউন্ডেশনের সূচনাও তার হাতেই। ২০০৪ সালে প্রণয়ন করেছিলেন কাতারের প্রথম স্থায়ী সংবিধান। নারীদের ভোটাধিকারসহ পৌর নির্বাচনের সূচনা হয় তার শাসনামলেই। বলা হয়ে থাকে, তার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই প্রথম আরব দেশ হিসেবে ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পায় কাতার।
ফিরে দেখা
১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে দোহায় জন্মেছিলেন শেখ হামাদ। ১৯৭১ সালে ব্রিটেনের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট থেকে স্নাতক করেন। হন সশস্ত্র বাহিনীর মেজর জেনারেল। কাতার সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৭ সালের মে মাসে যুবরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন।
১৯৮৯ সালে সুপ্রিম কাউন্সিল ফর প্ল্যানিংয়ের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। শুরু হয় কাতারের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন।
আমিরের দায়িত্ব পান ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন। ঠিক ১৮ বছর পর ২০১৩ সালের ২৫ জুন ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। আরব মুলকে এটি একটি বিরল ঘটনা। ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তার ভাষ্য ছিল, তরুণ নেতৃত্বই বহন করবে দেশের পতাকা।
যা কিছু কূটনীতি
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন শেখ হামাদ। দারফুর সংকট, লেবাননের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল এবং ফিলিস্তিনের হামাস ও ফাতাহর মধ্যকার বিরোধ নিরসনে মধ্যস্থতা করেছে তার দেশ।
আফগানিস্তানের তালিবানদের জন্য দোহায় রাজনৈতিক কার্যালয় খোলার অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি। এতে সুগম হয় যুক্তরাষ্ট্র ও তালিবানের মধ্যে আলোচনার পথ। ফলে ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় ন্যাটো ও মার্কিন সেনাদের।
শেখ হামাদের শাসনামলে ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত গণঅভ্যুত্থানগুলোর পক্ষে অবস্থান নেয় দোহা। তিউনিসিয়া, মিসর ও লিবিয়ার গণআন্দোলনে সমর্থন ছিল তার সরকারের। পাশাপাশি সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়ন বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবে তার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে ছিল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগ্রাম। ২০১২ সালের অক্টোবরে, এক দশকের মধ্যে প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা সফর করেছিলেন। আন্তর্জাতিক বয়কট উপেক্ষা করে সেই সফরে তিনি গাজার মানুষের জন্য ৯০ টন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যান। ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিলেন আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে। তাই তার চলে যাওয়া কাতার ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বরাজনীতিতে সৃষ্টি করল বিশাল শূন্যতার।









