যুদ্ধ যখন ঘরে ফেরে: একজন সৈনিকের বোনের দিনলিপি

সংগৃহীত ছবি
আমার ছোট বোন গত ১৯ বছর ধরে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত। এ সময়ে তিনি জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চল, সাউথ ক্যারোলাইনা এবং আরও নানা জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি সামরিক ঘাঁটিই তার ঠিকানা।
মাসের পর মাস ধরে আমি জানি সে কোথায় আছে এবং বিপদের কতটা কাছাকাছি রয়েছে। তবু এত দিন মনে হতো, যেন সে সত্যিই সেখানে নেই। কারণ ইরান যেন তার ঘাঁটি নয়, অন্য ঘাঁটিগুলোতেই হামলা চালাতে আগ্রহী ছিল। আর মার্কিন হতাহতের ঘটনাও ছিল খুবই বিরল। আমাদের কথাবার্তার বেশির ভাগই হতো তার একঘেয়েমি নিয়ে, বাজে খাবার নিয়ে, আর অসহ্য গরম ও মাছির উৎপাত নিয়ে।
মাঝেমধ্যে আমি তাকে বিভিন্ন সংবাদ পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করি, আমি যা পড়ছি সেগুলো তার আশপাশেই ঘটছে কি না। যদি উত্তর দেয়, সাধারণত বলে, ‘যা দেখছ, সব বিশ্বাস কোরো না।’ কিন্তু সে খুব বেশি কিছু বলে না। একদিকে সে চায় না আমি উদ্বিগ্ন হই, অন্যদিকে এমন অনেক তথ্য আছে, যা জানানোর অনুমতি তার নেই। কারণ অনেক। কিন্তু তার কোনোটি আমার রাতের ঘুম স্বস্তির করে না।
আমার বোন আর আমি যেন দুই মেরুর মানুষ। ছোটবেলা থেকেই আমি ভালো ফলাফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা আর তুলনামূলকভাবে প্রচলিত জীবন গড়ার দিকেই মনোযোগী ছিলাম। আর সে স্কুলজীবনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছে, আনন্দ করেছে। এরপর নিজের পথ খুঁজে নিতে কাজ শুরু করে।
ছোটবেলায় আমাদের এই পার্থক্যই আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছিল। কিন্তু আমার বোন যখন বিমানবাহিনীতে যোগ দিল এবং আমাদের মধ্যে সত্যিকারের ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি হলো, তখন অদ্ভুতভাবে আমরা আরও কাছাকাছি চলে এলাম।
প্রায় ২০ বছর ধরে আমরা একই অঙ্গরাজ্যে থাকি না। তবু প্রায় প্রতিদিনই আমাদের কথা হয়, বার্তা আদান-প্রদান হয়। সামরিক বাহিনী থেকে ছুটি পেলেই সে আমার বাড়িতে আসে। এখন আমরা দুই বোন যতটা ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব, ঠিক ততটাই ঘনিষ্ঠ। দুই বছর আগে তার জীবনসঙ্গী হঠাৎ মারা গেলে আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি নিয়ে ১৩ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে তার কাছে চলে গিয়েছিলাম।
বিদেশে দায়িত্ব পালনকালে এক মাতাল চালকের গাড়ির ধাক্কায় সে গুরুতর আহত হওয়ার পরই প্রথম বুঝতে পারি, হাজার মাইল দূরে বসে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার অনুভূতি কেমন।
মেমোরিয়াল ডের আগেই তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। সে আমাকে বলেছিল, ‘একটা লেকের ধারে বাড়ি খুঁজতে শুরু করো।’ নির্দিষ্ট কোনো তারিখ না থাকায় কথাটার তেমন অর্থ ছিল না। তবু আমি খুঁজতে শুরু করি। তারপর মেমোরিয়াল ডে চলে গেল। জুন মাসের যে সম্ভাব্য তারিখের কথা ছিল, সেটিও পেরিয়ে গেল। এখন তার ফেরার নতুন তারিখ আগস্টের শেষ দিকে। কিন্তু আমরা দুজনই জানি, আগের তারিখগুলোর মতো এটিও কতটা অনিশ্চিত।
জুলাই মাসের এক সোমবার আমি তাকে নিজের হাতে বানানো ফ্রেঞ্চ টোস্টের একটি ছবি পাঠিয়েছিলাম। জবাবে সে একটি মজার জিআইএফ পাঠিয়ে আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় বলল, ‘দূর হও’, কারণ সে নাকি প্রতিদিন ভাত খেতে খেতে ক্লান্ত। এরপর সে নিজের মাথায় পাওয়া কয়েকটি পাকা চুলের ছবি পাঠাল। আমিও আমার পাকা চুলের ছবি পাঠালাম। ছয় হাজার মাইল দূরে থাকা মধ্যবয়সী দুই বোন একে অপরকে এ ধরনের ছবিই পাঠায়।
সপ্তাহের শেষ দিকে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সে আমাকে ভিডিও কল করল। তখন আমার সময় সন্ধ্যা হলেও তার ওখানে রাত আড়াইটা। চারপাশ এতটাই অন্ধকার ছিল যে, তার মাথার হেলমেট আর গায়ে থাকা সুরক্ষা জ্যাকেট ছাড়া আর কিছুই ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না।
খুব শান্ত গলায় সে জানাল, কিছুক্ষণ আগেই তাদের ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। যে ভবনে তার এক বন্ধু থাকতেন, সেটিই হামলার শিকার হয়েছে। তিনি বেঁচে গেছেন, তবে এর বাইরে সে আর তেমন কিছু জানত না।
এক মুহূর্তের জন্য সে ক্যামেরা ঘুরিয়ে আমাকে বাইরে দেখাল। অন্ধকার আকাশের নিচে গোলাপি-বেগুনি রঙের ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছিল। রেডিওতে সে শুনেছিল, হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
দূরত্ব নতুন কিছু নয়। কিন্তু উদ্বেগের ধরন এখন বদলে গেছে। কয়েক দিন আগেও আমার বোন শুধু বিপদের কাছাকাছি ছিল। এখন সে এমন একটি হামলা থেকে বেঁচে ফিরেছে, যেখানে তিনজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। আমার মনোযোগ যেন হারিয়ে গেছে। হৃদয়জুড়ে শুধু উৎকণ্ঠা। এখন আমার ফোনের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় সংবাদ সতর্কবার্তা পড়তে আর বোনের পাঠানো বার্তা দেখতে।
আমি সব সময় তাকে জিজ্ঞেস করতে চাই না, ‘তুমি কি বেঁচে আছ?’ প্রশ্নটি খুবই নিষ্ঠুর শোনায়। কিন্তু আমার জানতেই হবে, সে বেঁচে আছে। সম্প্রতি আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমার কি ভয় লাগছে?’ তার ১৯ বছরের সামরিক জীবনে এই প্রথম আমি তাকে এমন প্রশ্ন করলাম।
সে জবাব দিয়েছিল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। যে-ই বলবে ভয় লাগছে না, সে মিথ্যা বলছে।’
সংবাদমাধ্যমে খবর আসতে অনেক সময় লাগে। গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগেই আমি ঘটনাটি জেনে গিয়েছিলাম। তাই আমি টিকটক ঘেঁটে তার কাছে পাঠানোর মতো মজার ভিডিও খুঁজছিলাম। কারণ সে যখন ভিডিওটিতে প্রতিক্রিয়া জানায়, তখন আমি বুঝতে পারি, সে ভালো আছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসে আমরা এই যুদ্ধ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করি—ইরানের শাসকগোষ্ঠী কতটা খারাপ, সেখানে আমাদের থাকা উচিত কি না, কিংবা এই প্রশাসন সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না।
কিন্তু আমার বোনের কাছে যুদ্ধ কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। তাই আমি তাকে আমার খাবারের ছবি, কুকুরগুলোর ছবি আর মজার টিকটক ভিডিও পাঠিয়ে যাব। যেন সে জানে, তাকে কতটা ভালোবাসা হয়। আর আমি জানতে পারি, সে এখনও সেখানে আছে।
কারেন মার্কস ‘ডিজাইন ইয়োর সাপোর্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা। সেখানে তিনি ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর গ্রাহকসেবা গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলোর বাইরে স্বামী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন। তার বোন ১৯ বছর ধরে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত। প্রথমে তিনি বিমানবাহিনীতে এবং বর্তমানে এয়ার ন্যাশনাল গার্ডে দায়িত্ব পালন করছেন।
মিলিটারি টাইমস থেকে অনূদিত।




