ডাবলিনে বাংলাদেশের প্রথম আবাসিক রাষ্ট্রদূত নূরে-আলম

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূরে-আলম। ছবি: সংগৃহীত
লন্ডন থেকে নয়, এবার আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন থেকেই পরিচালিত হবে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ। বাংলাদেশের প্রথম আবাসিক দূতাবাস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে দেশটিতে। নতুন এই মিশনের প্রথম আবাসিক রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূরে-আলম। দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও ডাবলিনে সরাসরি আবাসিক উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের রদবদলের অংশ হিসেবে কয়েকটি দেশে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। ওই তালিকায় আয়ারল্যান্ডের জন্য নূরে-আলমের নাম ছিল। আয়ারল্যান্ডে নিয়োগের আগে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পেশাদার এই কূটনীতিকের বিদেশে বিভিন্ন বাংলাদেশি মিশনে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। জেনেভায় জাতিসংঘের কার্যালয়ে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে কাউন্সেলর ছিলেন তিনি। পরে টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। জাপানে দায়িত্ব পালনের সময় বাংলাদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন বিষয়ে দূতাবাসের হয়ে কাজ করেছেন। পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবেও বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কসহ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন কূটনৈতিক বিষয়ে কাজ করেছেন।
আয়ারল্যান্ডে আবাসিক দূতাবাস স্থাপনের পটভূমি তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতির মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালের ১৩ মে ডাবলিনে দুই দেশের পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের প্রথম আনুষ্ঠানিক পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে নিয়মিত পরামর্শের বিষয়ে প্রথম সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক চুক্তি।
ওই বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অভিবাসন, শিক্ষা ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা হয়। আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশির কল্যাণের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুই দেশের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ রাজধানীতে আবাসিক দূতাবাস খোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশের কোনো স্থায়ী আবাসিক দূতাবাস নেই। লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ পরিচালিত হয়। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ডেরও ঢাকায় কোনো আবাসিক দূতাবাস নেই। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তাদের কোনো দূতাবাস বা কনস্যুলেট নেই। কনস্যুলার সহায়তার জন্য নয়াদিল্লিতে অবস্থিত আয়ারল্যান্ডের দূতাবাসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ডাবলিনে বাংলাদেশের আবাসিক দূতাবাস চালু হলে আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নাগরিক ও কনস্যুলার সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। পাসপোর্ট, নথি সত্যায়ন, জন্মনিবন্ধন, ক্ষমতাপত্র ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা সরাসরি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে কোন সেবা কখন থেকে চালু হবে এবং দূতাবাসের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের বিস্তারিত ঘোষণা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন মিশনের গুরুত্ব রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড বাণিজ্য ও শিল্প সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড বাণিজ্য ও শিল্প পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়। তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, পোশাক ও ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
২০২৬ সালেও দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মার্চে আয়ারল্যান্ডের ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত কেভিন কেলি, যিনি বাংলাদেশেও সমবর্তীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা, শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, অভিবাসন ও কনস্যুলার সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে আয়ারল্যান্ড বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাণিজ্য, অভিবাসন, দক্ষ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রে দুই দেশের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে ডাবলিনে বাংলাদেশের আবাসিক দূতাবাস শুধু নতুন একটি কূটনৈতিক কার্যালয় নয়, দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
তবে নতুন মিশনের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর আগে কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর কূটনৈতিক তালিকা প্রকাশ করলেও আয়ারল্যান্ড সরকার এখনো নতুন বাংলাদেশি মিশনের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা, জনবল, কনস্যুলার সেবা চালুর সময়সূচি কিংবা নূরে-আলমের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি। জেনেভা ও টোকিওর অভিজ্ঞতা নিয়ে নূরে-আলমের সামনে এখন ডাবলিনে বাংলাদেশের নতুন আবাসিক কূটনৈতিক মিশনের ভিত্তি গড়ে তোলার দায়িত্ব।




