যুদ্ধের ছায়ায় নতুন বিশ্ব রাজনীতির হিসাব

সংগৃহীত ছবি
‘বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র বদলালে বদলে যায় কূটনীতির টেবিলও।’ বদলে যাওয়া সমীকরণেরই ছবি দেখা যাচ্ছে দিল্লির অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলনে। একই ছাদের নিচে বসছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট, হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির নতুন ভারসাম্যের মধ্যে শুরু হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন।
ভারতের সভাপতিত্বে আজ ও আগামীকাল নয়াদিল্লির ‘ভারত মন্ডপম’-এ অনুষ্ঠিত হবে এই সম্মেলন। এবারের ব্রিকসের মূল সুর: স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন। তবে কূটনৈতিক মহলের চোখে এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব অর্থনীতির বাইরে। কারণ একই মঞ্চে থাকছেন এমন কয়েকটি দেশের নেতা; যাদের স্বার্থ, নিরাপত্তা ভাবনা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক একে অপরের থেকে অনেকটাই আলাদা। খবর এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
ব্রিকস ঘিরে ৩০ হাজার নিরাপত্তারক্ষীর কড়া পাহারায় রয়েছে দিল্লি। গতকাল শুক্রবার থেকেই শুরু হয়েছে কূটনৈতিক ব্যস্ততা। সম্মেলনের আগের দিনই তিন দিনের সফরে দিল্লি পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ভারত মন্ডপমে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারা। দুই নেতার আলোচনায় ভারত-রাশিয়া কৌশলগত সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি বাণিজ্য এবং পশ্চিম এশিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মোদি ও পুতিন সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং চলমান সংঘাতের কারণে বাণিজ্যে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো নিয়েও মতবিনিময় করেছেন। একই দিনে এসেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। বৈঠকের কথা রয়েছে তার সঙ্গেও।
পুতিনের দিল্লি সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ভারত রাশিয়ার অন্যতম বড় জ্বালানি ক্রেতা হিসেবে রয়েছে। অন্যদিকে মস্কো ব্রিকসকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে, যেখানে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বাইরে নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্মেলনের আরেক বড় আকর্ষণ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ সম্মেলনের আগেই দিল্লিতে নামবেন তিনি। গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে তার ভারত সফরকে ঘিরে কৌতূহল রয়েছে। ২০১৯ সালের মহাবলীপুরম বৈঠকের পর এটি দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিকসের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতিও এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায়। প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে পেজেশকিয়ানের বৈঠকে ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং ভারত-ইরান সম্পর্ক গুরুত্ব পেতে পারে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ তৈরি করছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপস্থিতি। ইউএইর পক্ষ থেকে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং সৌদির পক্ষ থেকে বিদেশমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। ইরান সংকটের সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— ব্রিকস কি শুধু প্রতীকী শক্তি হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিই নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার একটি কার্যকর স্তম্ভ হয়ে উঠবে? দিল্লির মঞ্চে পুতিন, শি, পেজেশকিয়ান ও মোদির উপস্থিতি সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবে।



