বিশ্বের সর্বশেষ দুর্ধর্ষ গেরিলাদের আত্মসমর্পণ
অন্তিমশয়নে ভারতের মাওবাদী বিদ্রোহ
- রাষ্ট্রের শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মাও সেতুংয়ের গেরিলা কৌশল অনুসরণ করত নকশালরা। তাদের মূল কৌশল ছিল আকস্মিক হামলা, দ্রুত স্থান পরিবর্তন এবং প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা

ছবি- বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশ
মধ্য ভারতের ঘন জঙ্গল থেকে সম্প্রতি বেরিয়ে আসেন মাওবাদী নেতা পাপা রাও। পরনে বিবর্ণ চেক শার্ট, ধুলোমাখা প্যান্ট ও পুরনো ক্রীড়াজুতা। কাঁধে ঝোলানো ছিল একটি রাইফেল। আর তার মাথার দাম প্রায় ২৬ হাজার ডলার (রাষ্ট্রীয় ঘোষণা)। পেছনে সারিবদ্ধভাবে হাঁটছিলেন নারী-পুরুষ মিলিয়ে আরও কয়েকজন বিদ্রোহী। তাদের হাতেও ছিল বহু দশক পুরনো এল১এ১ ও লি-এনফিল্ড রাইফেল। কারও পায়ে স্যান্ডেল, কারও কাঁধে সাধারণ স্পোর্টস ব্যাগ। একসময়কার এ গেরিলারাই বিশ্বের শেষদিকের মাওবাদী বিদ্রোহীদের অন্যতম প্রতিনিধি। এবার আর যুদ্ধ করতে নয়। জঙ্গলের মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে এসেছেন আত্মসমর্পণে।
চীনা কমিউনিস্ট নেতা মাও সেতুংয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কয়েক দশক ধরে ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। লক্ষ্য ছিল শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। দীর্ঘ এই সংঘাতে প্রাণহানি ঘটেছে হাজার হাজার মানুষের। প্রায় দুই দশক আগে ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব মাওবাদীদের দেশের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তখন এ বিদ্রোহকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের ভাবমূর্তি ও বৈশ্বিক শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষার জন্য বড় বাধা হিসেবে দেখা হতো।
এখন পাল্টে গেছে। বদলে গেছে আগাগোড়া। মাওবাদীদের বিদ্রোহ এখন অন্তিম পর্যায়ে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বেশ কয়েকজন শীর্ষ মাওবাদী নেতা নিহত হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে। একই সঙ্গে অস্ত্র ছেড়ে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিচ্ছেন সাধারণ সদস্যরাও।
ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের রাজনৈতিক আধিপত্যও মাওবাদী আন্দোলনের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই দেশ থেকে মাওবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে।
জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে আসার কয়েক ঘণ্টা পর পাপা রাও ও তার ১৭ সহযোগীকে একটি অনুষ্ঠানে মঞ্চে তোলা হয়। তাদের পেছনে বড় ব্যানারে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় লেখা ছিল— ‘মূল ধারায় প্রত্যাবর্তন’। আত্মসমর্পণ করা পুরনো অস্ত্রগুলো প্রদর্শন করা হয় জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য।
গত মার্চে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে প্রত্যেক সাবেক বিদ্রোহীর হাতে একটি গোলাপ ফুল এবং ভারতের সংবিধানের একটি কপি তুলে দেওয়া হয়। এটি ছিল রাষ্ট্রের প্রতি নতুন আনুগত্যের প্রতীকী অঙ্গীকার। পরে তারা স্থানীয় রাজনীতিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন।
মাওবাদী আন্দোলনের শিকড় খুঁজতে হলে প্রায় এক শতাব্দী পেছনে যেতে হয়। চীনে মাও সেতুং মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বকে নিজের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নতুন রূপ দেন। সেই আদর্শের ভিত্তিতে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্টদের বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরে বেইজিং ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলোকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। ফলে শীতল যুদ্ধের সময় এশিয়া জুড়ে আদর্শিক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ভারতে মাওবাদীরা ‘নকশাল’ নামে বেশি পরিচিত। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামে জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ থেকে এই নামের উৎপত্তি। ওই আন্দোলনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৭০ সালে চীনা সরকারের ইংরেজি ভাষার মুখপত্র ‘পেকিং রিভিউ’ এক প্রতিবেদনে ভারতীয় কৃষকদের ‘মাও সেতুং চিন্তাধারা’ অনুসরণের প্রশংসা করে। সেখানে দাবি করা হয়, তারা সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ভেঙে অত্যাচারী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, চীন আদর্শিক সমর্থন দিলেও ভারতীয় নকশালদের সরাসরি অস্ত্র সরবরাহের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর এক প্রতিবেদনে ভারতের নকশাল আন্দোলন সম্পর্কে সতর্ক মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গেরিলাদের আকস্মিক হামলা, বোমা বিস্ফোরণ, হত্যাকাণ্ড, বই পোড়ানো এবং পুলিশ স্টেশন, সিনেমা হল ও গ্রন্থাগারে আক্রমণের মতো ঘটনাগুলো ব্যাপক প্রচার পেত। এসব কর্মকাণ্ডই আন্দোলনকে নতুন অনুপ্রেরণা ও সদস্য সংগ্রহে সহায়তা করত।
পরের কয়েক দশকে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও নেতৃত্বসংকট সত্ত্বেও নকশালরা ভারতের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। এই অঞ্চলটি পরে ‘রেড করিডর’ নামে পরিচিতি পায়। দুর্গম বনাঞ্চল ও পাহাড়ঘেরা এই এলাকায় বিপুলসংখ্যক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, যারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল।
অনেক আদিবাসীর কাছে নকশালদের বার্তা তাই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ৪৫ বছর বয়সী সাবেক মাওবাদী সদস্য সুখমতি ধ্রুবও তাদের একজন। ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের গ্রামীণ এলাকায় বেড়ে ওঠা সুখমতি বলেছেন, ছোটবেলায় তিনি দেখেছেন কীভাবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা দরিদ্র গ্রামবাসীদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি নির্মাণ কিংবা জ্বালানি কাঠ কাটার জন্যও গ্রামবাসীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হতো। প্রতিবাদ করলে অনেককে মারধরের শিকার হতে হতো। এসব অভিজ্ঞতা তাকে কিশোরী বয়সেই নকশাল আন্দোলনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে।
সাবেক মাওবাদী নেতা পাপা রাওয়ের গল্পও প্রায় একই। বলেছেন, দারিদ্র্য এবং বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের হয়রানিই তাকে বিদ্রোহী দলে যোগ দিতে প্রভাবিত করেছিল। রাষ্ট্রের শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মাও সেতুংয়ের গেরিলা কৌশল অনুসরণ করত নকশালরা। তাদের মূল কৌশল ছিল আকস্মিক হামলা, দ্রুত স্থান পরিবর্তন এবং প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা। সুখমতি জানিয়েছেন, অস্ত্র সংগ্রহের জন্য তারা অনেক সময় পুলিশ স্টেশনে হামলা চালাতেন। একটি অভিযানের সফলতা নির্ধারিত হতো পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে কতগুলো অস্ত্র দখল করা গেছে তার ওপর।
আরেক সাবেক মাওবাদী সতীশের ভাষ্য, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা, তাদের অবস্থান, ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য এবং নিজেদের অস্ত্রশক্তি বিবেচনা করে তারা পরিকল্পনা করতেন। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে পিছু হটতেন আর সুযোগ পেলে প্রতিপক্ষের দুর্বল স্থানে আঘাত হানতেন।
২০০০ সালের শুরুতে নকশাল বিদ্রোহ পৌঁছে যায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তখন ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ও আউটসোর্সিং খাত দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল এবং দেশ জুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। সেই সময় নকশাল আন্দোলন ছিল এই উত্থানের বিপরীতে এক সহিংস প্রতিক্রিয়া।
২০০৩ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হায়দরাবাদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অল্পের জন্য একটি হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যান। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৭ সালের মধ্যে নকশালদের প্রভাব বিস্তার করেছিল প্রায় ৯২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের আয়তনের কাছাকাছি।
২০০৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং নকশালদের ভারতের জন্য ‘সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর পরের বছর ছত্তিশগড়ে এক অতর্কিত হামলায় ৭৬ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন, যা ছিল সংঘাতের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বামপন্থী চরমপন্থী সহিংসতায় পুরো ভারতে প্রায় ৯ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তবে এ সংঘাতে শুধু নকশালরাই নয়, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। অপহরণ, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে উভয়পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।






