নির্ভয়ার শহরে আজও পায়ে পায়ে ভয়

দিল্লির কোনো স্কুলের বাইরে, মেট্রোস্টেশনের সামনে কিংবা আলো কম থাকা কোনো পার্কের পাশে শিগগির দেখা যেতে পারে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী পুলিশের দল। তাদের কাজ শুধু অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর অভিযুক্তকে খোঁজা নয়, বরং বিপদের আগেই দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করা, উত্ত্যক্তকারীদের নিবৃত্ত করা এবং বিপদে পড়া নারী বা শিশুর কাছে দ্রুত পৌঁছে যাওয়া।
নির্ভয়া-কাণ্ডের ১৪ বছর পরও দিল্লিতে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থামেনি। সাম্প্রতিক কয়েকটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সেই পুরনো ক্ষত আবার সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতিতেই গোয়ার আদলে দিল্লিতে ‘পিংক ফোর্স’ বা বিশেষ নারী টহল বাহিনী গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রশাসন। গত ২২ সেপ্টেম্বর এনডিটিভিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১০ দিনের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের চারটি অভিযোগ সামনে আসার পর দিল্লির উপরাজ্যপাল তরনজিৎ সিং সান্ধু বিশেষ নারী টহল বাহিনী গঠনের নির্দেশ দেন। প্রস্তাবিত বাহিনীতে থাকবেন প্রশিক্ষিত নারী পুলিশ সদস্যরা। তাদের স্কুল, কলেজ, মেট্রোস্টেশন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সময় ও স্থানকে। সান্ধুর ভাষায়, নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘আপসহীন’ অবস্থানে থাকবে প্রশাসন। নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত সাড়া দেওয়া। তবে সদস্যসংখ্যা, উদ্বোধনের তারিখ ও মোতায়েনের এলাকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ ‘পিংক ফোর্স’ এখনো পরিকল্পনা ও কাঠামো তৈরির পর্যায়ে রয়েছে।
এ পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে কয়েকটি ভয়াবহ অভিযোগ। সদর বাজারে খাতা-কলম কিনতে বের হওয়া এক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে দোকানের ভেতরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। দেশবন্ধু গুপ্তা রোড এলাকায় ছয় বছরের এক শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। কালকাজির আস্থা কুঞ্জ উদ্যানে ১৭ বছরের এক কিশোরী অভিযোগ করেন, তিন ব্যক্তি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে বন্ধুর কাছ থেকে আলাদা করেন। পরে তাকে যৌন নিপীড়ন করা হয়। মামলাগুলো তদন্ত করছে পুলিশ।
এ ঘটনাগুলো দিল্লিতে একটি পুরনো নামকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে— ‘নির্ভয়া’। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে ২৩ বছর বয়সী এক তরুণী তার বন্ধুর সঙ্গে একটি বাসে ওঠেন। চলন্ত বাসে তাকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্মম নির্যাতন করা হয়। তার বন্ধুকেও মারধর করা হয়। পরে দুজনকে রাস্তার পাশে ফেলে যায় হামলাকারীরা। গুরুতর আহত তরুণীকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। ২৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। পরিচয় গোপন রাখতে সংবাদমাধ্যম তাকে ‘নির্ভয়া’— অর্থাৎ ‘নির্ভীক’ নামে উল্লেখ করতে শুরু করে। ঘটনাটি ভারত জুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। হাজার হাজার মানুষ নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। পরে যৌন অপরাধবিষয়ক আইন আরও কঠোর করা হয়। মামলার চার দণ্ডিতকে ২০২০ সালের ২০ মার্চ দিল্লির তিহার কারাগারে ফাঁসি দেওয়া হয়। কিন্তু আইন বদলালেও দিল্লির নারীরা কতটা নিরাপদ হয়েছেন, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।
দিল্লির ‘পিংক ফোর্স’-এর আদর্শ গোয়া। ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর সেখানে ২৫০ সদস্যের বিশেষ বাহিনী চালু হয়। প্রথমে ১১টি থানাকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম শুরু হয়। পরে বাড়ানো হয় এর পরিধি। গোয়ার এই বাহিনী নারী, শিশু ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করে। বিপদে থাকা নারী বা শিশুর কাছে পাঁচ থেকে আট মিনিটের মধ্যে পৌঁছানো তাদের লক্ষ্য। মামলা, গ্রেপ্তার ও তদন্তের মূল দায়িত্ব স্থানীয় থানার। ‘পিংক ফোর্স’-এর প্রধান কাজ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, নিরাপত্তা দেওয়া এবং অপরাধ প্রতিরোধে দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করা।
গোয়ার অভিজ্ঞতাও দিল্লির আগ্রহ বাড়িয়েছে। এক নারী জরুরি নম্বরে ফোন করে জানিয়েছেন, এক অচেনা ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করছেন। ‘পিংক ফোর্স’-এর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই ব্যক্তিকে অন্ধকার জায়গায় পাথরের আড়াল থেকে খুঁজে বের করে আটক করেন। পরে তাকে স্থানীয় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। গোয়া পুলিশ বলেছে, বাহিনীটির মূল দর্শন হলো, অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শুধু অভিযুক্তকে শনাক্ত করা নয়, বরং সম্ভাব্য অপরাধ ঠেকানো। তবে নতুন বাহিনী গড়লেই দিল্লির সমস্যা মিটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।



