ব্রিকসের বিস্তৃতি এখন ভারতের কূটনৈতিক বোঝা
- অর্থায়ন ও ‘গ্লোবাল সাউথ’-এ নেতৃত্বের সুযোগ একদিকে, অন্যদিকে চীনের প্রভাব আর সদস্যদের সংঘাত
- দিল্লির সামনে কঠিন হিসাব

ব্রিকসই এখন ভারতের জন্য সুযোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক বোঝাও হয়ে উঠছে।
নয়াদিল্লিতে আর ক’দিন পরই বসছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের বড় উদীয়মান শক্তিগুলোর নেতারা এক টেবিলে বসবেন, আর সেই টেবিলের মাথায় থাকবে ভারত। বাইরে থেকে ছবিটা মর্যাদার; ভেতরে হিসাবটা অনেক বেশি জটিল। কারণ যে জোটকে নয়াদিল্লি একসময় বহুমেরু বিশ্বের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিল, সেই ব্রিকসই এখন তার জন্য সুযোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক বোঝাও হয়ে উঠছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ব্রিকস থেকে ভারত আসলে কী পাচ্ছে, আর সেই লাভ কি ক্রমবর্ধমান ঝামেলার মূল্য চুকানোর মতো? আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রাজিল, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়াসহ সদস্যদেশগুলোর নেতারা মিলিত হওয়ার কথা। এটি ভারতের চতুর্থ ব্রিকস আয়োজন।
সমস্যা শুরু হয়েছে জোটের ভেতরের বিরোধ থেকেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার পর তেহরান সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়–তিন দেশই ব্রিকসের পরিসরের অংশ। ফলে একই টেবিলে এমন রাষ্ট্রগুলোকে বসাতে হচ্ছে, যাদের স্বার্থ শুধু আলাদা নয়, কোথাও কোথাও সরাসরি সংঘাতপূর্ণ। মে মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। পশ্চিম এশিয়ার সংকট নিয়ে সদস্যরা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। দিল্লির আশঙ্কা, শীর্ষ সম্মেলনেও একই ঘটনা ঘটলে তা আয়োজক ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক অস্বস্তি হবে।
২০২১ সালে ভারত যখন শেষবার ব্রিকস সম্মেলন আয়োজন করেছিল, সদস্য ছিল পাঁচটি: ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এখন জোটটি ১১ সদস্যের, যদিও সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা আছে। সম্প্রসারণ ব্রিকসকে বড় করেছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়াকে করেছে কঠিন। ভারত-চীন মতবিরোধ সামলানোই আগে কঠিন ছিল; এখন একই জোটে পরস্পরবিরোধী আঞ্চলিক শক্তিও রয়েছে।
তবু ভারতের লাভ একেবারে কাগুজে নয়। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এনডিবি অবকাঠামো, আবাসন, মেট্রোরেল, শিক্ষা ও জ্বালানি প্রকল্পে অর্থ দিচ্ছে। ব্যাংকের ২০২৫ সালের শেষের সক্রিয় পোর্টফোলিওর ২৫ শতাংশই ভারতের প্রকল্পে ছিল। ২০২৬ সালেও লক্ষ্ণৌ মেট্রো, সাশ্রয়ী আবাসন, শিক্ষা অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে নতুন ভারতীয় প্রকল্প অনুমোদন করেছে এনডিবি।
ব্রিকস ভারতের আরেকটি বড় প্রয়োজনও মেটায়৷ তা হচ্ছে পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতৃত্ব দাবি করার জায়গা। নয়াদিল্লি চায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও অন্য বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠ জোরালো হোক। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে রুপি-রুবল ব্যবস্থার বিস্তার এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর আলোচনা ডলারনির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ দিচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভারত-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৯৬ শতাংশ এখন রুপি ও রুবলে নিষ্পত্তি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জায়গাটিও ছোট নয়। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য বলছে, গত দুই দশকে ব্রিকস দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্য দ্রুত বেড়েছে। তবে জোটের মোট অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত ওজনের তুলনায় সদস্যদের নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য এখনও সীমিত। ফলে দিল্লির কাছে ব্রিকসের আসল পরীক্ষা হলো রাজনৈতিক ঘোষণাকে বাস্তব বাজার, বিনিয়োগ ও অর্থায়নের সুযোগে রূপ দেওয়া।
এবারের সম্মেলন ভারত-চীন সম্পর্কের জন্যও আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছর পর ভারত সফরে আসতে পারেন। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, ব্রিকসের মঞ্চ সেটি সামলানোর একটি কূটনৈতিক জানালাও খুলে দিচ্ছে। যদিও মূল বিরোধ রয়ে গেছে।
কিন্তু এখানেই ভারতের দ্বিধা। চীন ব্রিকসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি, অথচ বেইজিংয়ের সঙ্গে দিল্লির সীমান্ত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনও শেষ হয়নি। সম্প্রসারণে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বাড়লে জোটটি পশ্চিমবিরোধী মঞ্চে পরিণত হতে পারে, যা ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর সঙ্গে যায় না। ভারত একই সঙ্গে কোয়াডে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ।
তাই ব্রিকস ভারতের জন্য লাভ না বোঝা, উত্তরটি সাদা-কালো নয়। অর্থায়ন, বাজার, কূটনৈতিক মর্যাদা ও গ্লোবাল সাউথে নেতৃত্বের সুযোগ দিলেও জোটের ভেতরের সংঘাত এবং চীনের বাড়তি ওজন দিল্লিকে সতর্ক রাখছে। এবারের সম্মেলন তাই শুধু ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নয়, ভারতের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিরও বড় পরীক্ষা।





