জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে দিল্লি অবরুদ্ধ
পুলিশের ঘেরাটোপেও থামল না ছাত্রদের প্রতিবাদ

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় কারচুপি করে শাসক বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযোগে শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখায় যুব সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি-সহ বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বিক্ষোভ দমনে রাজধানীকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে। তবে ব্যাপক ধরপাকড় ও পুলিশি বাধা সত্ত্বেও প্রতিবাদ থামেনি।
শনিবার দিল্লির কনট প্লেস এলাকায় পুলিশের মাইকে বারবার ঘোষণা করা হয়, জমায়েত বা মিছিল করা যাবে না। রাস্তায় বসানো হয় একাধিক স্তরের হলুদ ব্যারিকেড। মোতায়েন করা হয় পুলিশ ও আধাসেনা। শহরের কেন্দ্রস্থল কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়ে।
কনট প্লেস থেকে কয়েকশো মিটার দূরে যন্তর মন্তর। আইনত সেখানে প্রতিবাদ কর্মসূচি করা যায়। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের সেখানে পৌঁছতে বাধা দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় এলাকার একাধিক মেট্রো স্টেশন। শুক্রবার রাত ১০টা থেকে বন্ধ রাখা হয় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও। অন্য রাজ্য থেকে আন্দোলনকারীদের দিল্লিতে আসা আটকাতে শতাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়।
দিল্লির রাস্তায় মোতায়েন করা হয় উত্তরপ্রদেশ পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ), র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) এবং সশস্ত্র সীমা বলের জওয়ানদের। বিএসএফের এক জওয়ান জানান, গুজরাতের পাকিস্তান সীমান্ত থেকে তাকে দিল্লিতে আনা হয়েছে।
শনিবার সকালেই শুরু হয় ধরপাকড়। সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে মে মাসে গড়ে ওঠা যুব সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বকে দিল্লিতে পৌঁছনোর পর বিমান থেকে নামার আগেই আটক করা হয়। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ দিল্লি পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০০। তাঁদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন, যারা সক্রিয় ভাবে কোনও প্রতিবাদে অংশ নেননি। এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার জন্যও এক ব্যক্তিকে আটক করা হয় বলে প্রতিবেদকের দাবি।
তবু আন্দোলনকারীরা পিছিয়ে যাননি। টলস্টয় রোডে ব্যারিকেডের সামনে ছোট ছোট দলে জমায়েত হন তারা। পুণে থেকে আসা এক ব্যক্তি প্রতিবাদ জানানোর অধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে নিজেই পুলিশের বাসে গিয়ে বসেন। অন্য দিকে, সুশীল আহুজা নামে এক ব্যক্তি গিটার বাজিয়ে বলেন, মৃত্যুর আগে তিনি দেশকে স্বাধীন দেখতে চান।
পুলিশের ধরপাকড় এড়াতে বহু বিক্ষোভকারী আশ্রয় নেন অষ্টাদশ শতকের বাংলা সাহিব গুরুদ্বারে। বাইরে কয়েকশো পুলিশ ও আধাসেনা মোতায়েন থাকলেও তাঁরা গুরুদ্বারের ভিতরে ঢোকেননি। অন্যত্র পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। গেরুয়া স্কার্ফ পরা হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সদস্যেরা বিক্ষোভকারীদের মারধর করেন। সেই ঘটনার ভিডিয়োও ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরপ্রদেশের ঝাঁসি থেকে আসা দেবেন্দ্র পাল বলেন, ভারতকে ভাগ করতে চাইলে ‘ককরোচ’দের এভাবেই মারধর করা হবে। অন্যদিকে, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া মানীশের অভিযোগ, দক্ষিণপন্থীরা আন্দোলনকারী ও সাংবাদিকদের হেনস্থা করলেও পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল।
পুলিশি অবরোধের জেরে সমস্যায় পড়েন সাধারণ মানুষও। সোনিপতে কর্মরত বিহারের পরিযায়ী শ্রমিক সচিন ঝা তাঁর শিশুসন্তানকে নিয়ে লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে এসেছিলেন। অস্ত্রোপচারের আগে শিশুটির পরীক্ষা করানোর কথা ছিল। কিন্তু যানবাহনের অভাব ও ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের কাছে বাড়ি ফেরার টাকাও ছিল না।
রাঁচির তরুণ আন্দোলনকারী অপূর্ব জানান, মহাত্মা গান্ধীর সাজে এক ব্যক্তি প্রতিবাদে যোগ দিয়েছিলেন। তাকে ঘিরে ভিড় জমতে শুরু করতেই পুলিশ তাড়া করে তাকে সরিয়ে দেয়। ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগের জবাব দেওয়ার বদলে প্রতিবাদ দমনে এত বিপুল পুলিশি আয়োজন কেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে। জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।



