ধনী হওয়ার আগেই বয়স্কের ভারে নুয়ে পড়বে ভারত
- ২০৫০-এ প্রতি পাঁচজনে একজন ষাটোর্ধ্ব

কয়েক দশকে ভারতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা এমন হারে বাড়তে পারে যে অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ দেশ হওয়ার আগেই জনসংখ্যার বড় অংশ প্রবীণ হয়ে পড়বে।
জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম তরুণ দেশ ভারত। কিন্তু সেই ছবিই দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জন্মহার কমছে, পরিবারের আকার ছোট হচ্ছে, কর্মসূত্রে তরুণদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং মানুষের আয়ুও দীর্ঘ হচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক দশকে ভারতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা এমন হারে বাড়তে পারে যে অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ দেশ হওয়ার আগেই জনসংখ্যার বড় অংশ প্রবীণ হয়ে পড়বে।
গ্রামীণ ভারতের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় এমনই সতর্কবার্তা উঠে এসেছে। উল্লেখ্য যে, গত ১৪ আগস্ট প্রকাশিত ‘ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন, ইভলভিং ফ্যামিলিস অ্যান্ড দ্য ফিউচার অফ দ্য কেয়ার ইকোসিস্টেম ইন রুরাল ইন্ডিয়া’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের শহরাঞ্চলে প্রতি পাঁচজনের একজনের বয়স ৬০ বছরের বেশি হতে পারে। বর্তমান জনসংখ্যার হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি ৭০ লক্ষ। যদিও এই নির্দিষ্ট হিসাবটি শহুরে ভারতের জন্য দেওয়া হয়েছে। বৃহত্তর জাতীয় পূর্বাভাসও একই প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ কোটি ৯০ লক্ষ, যা মোট জনসংখ্যার ১০.৫ শতাংশ। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ২০.৮ শতাংশ বা ৩৪ কোটি ৭০ লক্ষে পৌঁছতে পারে।
গ্রামীণ ভারতের পরিস্থিতিও কম উদ্বেগজনক নয়। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় ৭ জন এমন বয়সের মানুষ, যাদের ভবিষ্যতে নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে কমছে পরিবারের দেখাশোনার সক্ষমতা। ২০০১ সালে একজন বয়স্ক মানুষের বিপরীতে কর্মক্ষম বয়সের প্রাপ্তবয়স্কের অনুপাত ছিল ৮.৪। ২০২৬ সালের শেষে সেই অনুপাত কমে ৫.২-তে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ পরিবারের কাঠামোর বদল। আগের তুলনায় পরিবার ছোট হচ্ছে। তরুণরা কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহর কিংবা অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। ফলে বাড়িতে বয়স্ক বাবা মায়ের পাশে থাকার মতো পরিবারের সদস্য কমছে। অথচ বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৪ শতাংশ বয়স্ক মানুষের পরিচর্যার প্রধান দায়িত্ব এখনও পরিবারের উপরেই।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে মহিলাদের উপর। সরকারি সমীক্ষার তথ্যও বলছে, ভারতীয় মহিলারা প্রতিদিন গড়ে ৩০৫ মিনিট অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজে ব্যয় করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সময় মাত্র ৫৬ মিনিট। অর্থাৎ পরিবারের বয়স্ক, অসুস্থ ও নির্ভরশীল সদস্যদের দেখাশোনার ভারও অনেকাংশে মহিলাদের কাঁধেই থেকে যাচ্ছে।
সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, দেশে প্রতিবছর মোট মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই অসংক্রামক রোগের কারণে। ডায়াবিটিস, হৃদ্যন্ত্রের রোগ এবং ক্যানসারের মতো দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে শুধু চিকিৎসা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের সহায়তা এবং বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনও দ্রুত বাড়বে।
এই সমস্যার মোকাবিলায় সমীক্ষায় ‘পরিচর্যা’ মডেলের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু পরিবার নয়, গ্রাম পঞ্চায়েত, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এবং আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরের মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকেও পরিচর্যার ব্যবস্থায় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পূর্বাভাস ইতিমধ্যেই দেখাচ্ছে, ভারতের জনসংখ্যায় প্রবীণদের অংশ দ্রুত বাড়ছে। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আয় এবং পরিচর্যার পরিকাঠামো তৈরি করাই আগামী দিনের বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে চলেছে।






