কেমন ছিল ক্যামেরার আগের ভারত
- ইতিহাস শধু
- বইয়ে নয় ,লুকিয়ে থাকে শিল্পির হাতেও

একটি দেশের ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ কিংবা সাম্রাজ্যের কাহিনিতে লেখা থাকে না। ইতিহাস লুকিয়ে থাকে মানুষের মুখে, পোশাকে, অলঙ্কারে, পথেঘাটে, বাজারের ভিড়ে কিংবা কোনও অচেনা যাত্রীর চোখে। কিন্তু সেই মুখগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে যায় সময়ের অন্ধকারে। উনিশ শতকের ভারতও হয়তো তেমনই হারিয়ে যেত, যদি না এক ইংরেজ নারী তাঁর কৌতূহলী চোখ আর শিল্পীর হাতে সেই সময়কে ধরে রাখতেন কাগজের পাতায়। তাঁর নাম এমিলি ইডেন।
আজ যখন একটি মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী বন্দি হয়ে যায়, তখন কল্পনা করাও কঠিন যে এমন এক সময় ছিল, যখন কোনও মানুষের মুখ, কোনও শহরের দৃশ্য কিংবা কোনও সমাজের স্মৃতি সংরক্ষণের একমাত্র উপায় ছিল শিল্পীর তুলি। সেই সময়ের ভারতকে দেখার জন্য তাই ইতিহাসবিদেরা ফিরে যান এমিলি ইডেনের স্কেচবুকের কাছে। ১৮৩৬ সালের মার্চ মাস। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার বুকে নোঙর ফেলল একটি জাহাজ। সেই জাহাজে ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর-জেনারেল জর্জ ইডেন, আর্ল অব অকল্যান্ড এবং তাঁর বোন এমিলি ইডেন। অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারের শিক্ষিতা এই নারী তখনও জানতেন না, পরবর্তী ছয় বছর তাঁর জীবনকে যেমন বদলে দেবে, তেমনই ভারত সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধারণাকেও সমৃদ্ধ করবে।
প্রথমদিকে কলকাতার আবহাওয়া, অগণিত মশা, কাকের ডাক, শেয়ালের হুক্কাহুয়া, অপরিচিত সামাজিক রীতিনীতি এবং ইংল্যান্ড থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকার যন্ত্রণা তাঁকে প্রায় ভেঙে দিয়েছিল। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন নিজের একাকিত্বের কথা। অনেক সময় তাঁর মনে হতো যেন তিনি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন গ্রহে এসে পড়েছেন।
কিন্তু শিল্পীর চোখের একটি অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। তা শেষ পর্যন্ত বিস্ময়কে খুঁজে নেয়।
ধীরেধীরে ভারত তাঁর কাছে এক অচেনা ভূখণ্ড নয়, এক বিস্ময়ের মহাদেশ হয়ে উঠল। রাজপ্রাসাদের বাইরে যে বিশাল জীবন প্রবাহিত হচ্ছে, তার প্রতি গভীর আগ্রহ জন্ম নিল তাঁর। তিনি দেখতে শুরু করলেন মানুষকে- শুধু শাসককে নয়, শোষিতকেও; শুধু অভিজাতকে নয়, সাধারণ মানুষকেও। এমিলি ইডেনের স্কেচগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।
ঔপনিবেশিক যুগের বহু ইউরোপীয় শিল্পী ভারতকে দেখেছেন দূর থেকে। তাঁদের ছবিতে ভারত অনেক সময় এক রহস্যময়, রোমাঞ্চকর কিংবা বিদেশি প্রদর্শনীর মতো। কিন্তু এমিলির দৃষ্টি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি মানবিক এবং পর্যবেক্ষণনির্ভর। তিনি যেমন মহারাজা রণজিৎ সিংহকে এঁকেছেন, তেমনই এঁকেছেন তাঁর দরবারের পরিচারকদের। তিনি যেমন আফগান অভিজাতদের ছবি এঁকেছেন, তেমনই এঁকেছেন সাধারণ মুসলিম ছাত্র, সরকারি কর্মচারীর কন্যা কিংবা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আসা লাদাখি বণিক পরিবারের সদস্যদের।
তাঁর ছবিতে ভারতের মানুষরা ইতিহাসের চরিত্র নয়; তারা জীবন্ত মানুষ। কোথাও দেখা যায় ঝলমলে পাগড়ি পরা শিখ নিহাং যোদ্ধা। কোথাও আফগান নির্বাসিত এক পরিবারের ক্লান্ত অথচ মর্যাদাপূর্ণ মুখ। এই ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণগুলোই এমিলির কাজকে আলাদা করে দেয়।
১৮৩৬ থেকে ১৮৪২ - এই সময়টুকু ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অস্থির সন্ধিক্ষণ। শিখ সাম্রাজ্যের শেষ উজ্জ্বল দিনগুলো তখন ফুরিয়ে আসছে। আফগানিস্তানে ব্রিটিশ হস্তক্ষেপ নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করছে। উত্তর ভারতের ক্ষমতার মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এমিলি ইডেন সেই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। রণজিৎ সিংহের মৃত্যুর অল্প আগে তাঁর যে প্রতিকৃতি এমিলি এঁকেছিলেন, আজ তা শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, ইতিহাসের অমূল্য দলিল। সেই ছবিতে ধরা পড়েছে এক বৃদ্ধ শাসকের মুখ, যার চোখে এখনও ক্ষমতার দীপ্তি, অথচ যার সাম্রাজ্য অস্তগামী সূর্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।
তবে এমিলির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত তাঁর বিষয় নির্বাচনে। তিনি শুধু ক্ষমতার ইতিহাস আঁকেননি। তিনি এঁকেছেন মানুষের ইতিহাস। একজন ভৃত্যের পোশাক, এক শিশুর হাতে ধরা খেলনা, এক যাত্রীর মুখের রেখা, এক শিকারির সঙ্গে থাকা বাজপাখি -এসবই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কোনও সভ্যতাকে জানতে হলে শুধু তার রাজাদের দেখলে হয় না; দেখতে হয় তার সাধারণ মানুষদেরও।
অবশ্য তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সন্তান। ভারত সম্পর্কে তাঁর কৌতূহলের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপও তাঁর কাজেও পাওয়া যায়। তিনি ব্রিটিশ শাসনকে অনেকাংশে ‘সভ্যতা প্রদানের দায়িত্ব’ হিসেবে দেখতেন। ফলে তাঁর শিল্পকর্ম যেমন ভারতকে বোঝার উপায়, তেমনই তা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব বোঝারও একটি জানালা। তবু সময়ের বিচারে তাঁর কাজের মূল্য কমে না। কারণ ক্যামেরা আসার আগে ভারতের যে মুখ ছিল, তার অনেকটাই আজ দেখা যায় এমিলি ইডেনের ছবিতে। সেখানে আছে বারাণসীর ঘাট, পাঞ্জাবের দরবার, কলকাতার আঙিনা, পাহাড়ি পথের যাত্রী, শিখ যোদ্ধা, আফগান নির্বাসিত, মুসলিম ছাত্র, পরিচারক, শিশু - অসংখ্য মুখ, যারা হয়তো ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে মুছে যেত। প্রায় দুই শতাব্দী পরে সেই ছবিগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। কাগজের ওপর রঙিন সেই মানুষগুলো এখনও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা কথা বলে না, অথচ অনেক গল্প বলে। তারা নড়ে না, অথচ এক যুগের চলমান জীবনকে চোখের সামনে ফিরিয়ে আনে।
ভাষান্তর: রুবাইয়া জেসমিন







