জ্ঞানেশবিরোধী আন্দোলন
অচল হওয়ার পথে দিল্লি

সংগৃহীত ছবি
ভারতে নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে যে ছাত্র আন্দোলন একসময় উত্তাল করে তুলেছিল রাজধানী দিল্লিকে, এরই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা এবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ দাবিতে ছাত্র ও যুব আন্দোলনকে ঘিরে। আজ শনিবার আবারও দিল্লির রাজপথে নামার ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলো। আগের আন্দোলনে ছাত্রদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল পরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এবার সেই ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটাধিকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন। আন্দোলন শুরুর আগেই ভারতের রাজধানী জুড়ে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা, ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমনপথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত, গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনে ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধ এবং দিল্লির প্রবেশপথগুলোয় নজরদারি— সব মিলিয়ে ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের কাছে শনিবারের কর্মসূচি যে যথেষ্ট উদ্বেগের, তা বোঝা যাচ্ছে নিরাপত্তার প্রস্তুতি থেকেই। নয়াদিল্লি জেলায় ৩৭টি অবরোধস্থল এবং রাজধানীর ১৫টি জেলায় আটককেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। দিল্লি-নয়ডা, দিল্লি-গুরগাঁওসহ পাশের অঞ্চল থেকে রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের আশঙ্কা, দিল্লির বাইরের বিভিন্ন জায়গা থেকেও ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক কর্মীরা এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসতে পারেন। ফলে শুধু যন্তর মন্তর নয়, রাজধানীতে প্রবেশের প্রায় সব পথই শনিবারের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশের এই প্রস্তুতির মধ্যেই আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের বক্তব্য, তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও আন্দোলন থামবে না। তারপর অন্যরা এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবেন। অন্যদিকে, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল জানিয়েছেন, তার পরিবারের সদস্যরাও এই প্রতিবাদে যোগ দেবেন। ফলে একটি ছাত্র ও যুব আন্দোলন ক্রমেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদের চেহারা নিচ্ছে।
এখানেই নিট আন্দোলনের সঙ্গে শনিবারের কর্মসূচির মিল ও অমিল— দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ছাত্রদের ক্ষোভ একসময় জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছিল। এবার আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ। আন্দোলনকারীদের দাবি, যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ার বিষয়ে কমিশনকে জবাবদিহি করতে হবে। নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য তালিকাকে নির্ভুল করা। ফলে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৃহত্তর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক।
শনিবারের কর্মসূচির জন্য যন্তর মন্তরে অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ নম্বর ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমনপথ বন্ধ রাখা এবং নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধের সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের যাতায়াতও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, আগের ছাত্র আন্দোলনের মতো এবারও কি রাজধানীর স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হবে? আন্দোলনকারীরা বিপুল সংখ্যায় রাস্তায় নামলে পুলিশের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। আবার নিরাপত্তার কড়াকড়িতে জমায়েতের আকার সীমিত থাকলেও ভোটাধিকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থেমে যাবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
নিট আন্দোলনে ছাত্রদের ক্ষোভ ছিল পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। এবার সেই জায়গায় এসেছে ভোটার তালিকা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন। শনিবারের আন্দোলন তাই শুধু রাজধানীর আইনশৃঙ্খলার পরীক্ষা নয়, ছাত্র ও যুবসমাজের প্রতিবাদ কতটা বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে পৌঁছাতে পারে, তারও পরীক্ষা। দিল্লি শেষ পর্যন্ত অচল হবে কি না— তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে নিটের পর এবার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে ছাত্র আন্দোলন যে রাজধানীর রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট।



