পশ্চিমবঙ্গে আবারও ধর্ষণের অভিযুক্তকে পুলিশের এনকাউন্টার

পশ্চিমবঙ্গে আবারও ধর্ষণের অভিযুক্তকে পুলিশের এনকাউন্টার। বারুইপুরের ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। মঙ্গলবার ভোরে কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত প্রহ্লাদ দাসের পুলিশি গুলিতে মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের পর ফেরার পথে সার্ভিস রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে পুলিশকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান অভিযুক্ত। আত্মরক্ষার্থে পালটা গুলি চালায় পুলিশ। কিন্তু আইন-আদালতের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তের মৃত্যু এভাবে কেন? আর পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে কীভাবে তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছল সেই প্রশ্নগুলিই নতুন করে সামনে এসেছে।
গত রবিবার গাইঘাটায় প্রতিবেশীর বাড়ির পিছন থেকে ১৭ বছরের এক কিশোরীর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। শনিবার রাতে বাড়ির কাছে একটি জলসা দেখতে গিয়েছিল সে। পরিবারের দাবি, রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ ফোন আসার পর অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যায় কিশোরী। তার পর আর বাড়ি ফেরেনি। রাতভর খোঁজাখুঁজির পর রবিবার সকালে দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি ওই পরিবারেরই আত্মীয় বলে জানা গিয়েছে। ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছিল।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোরে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য প্রহ্লাদকে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেরার পথে তিনি পুলিশের সার্ভিস রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি চালান। সেই ঘটনায় এক পুলিশকর্মী আহত হন বলেও দাবি পুলিশের। পালটা চার রাউন্ড গুলি চালায় পুলিশ। গুলিবিদ্ধ প্রহ্লাদকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রশ্ন উঠছে, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের উপস্থিতিতে একজন ধৃত কীভাবে সার্ভিস রিভলবার ছিনিয়ে নিতে পারলেন? অভিযুক্তের হাতে অস্ত্র পৌঁছনোর পরিস্থিতি কী ছিল? তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় নিরাপত্তার ব্যবস্থা কেমন ছিল? গাইঘাটার ঘটনার সঙ্গে অনিবার্যভাবেই ফিরে আসছে বারুইপুরের স্মৃতি। কয়েক মাস আগে সেখানে এক নাবালিকাকে গণধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত প্রভাস মণ্ডলেরও পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু হয়েছিল। পুলিশের দাবি ছিল, অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। সেই ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্ট পুলিশের কাছে রিপোর্ট চেয়েছিল। সেই ঘটনার পর আবার গাইঘাটায় একই ধরনের বয়ান সামনে আসায় দুই ঘটনার মধ্যে সাদৃশ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গাইঘাটার ঘটনায় কিশোরীর বাবা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মেয়েকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তার কাছে পুলিশের পদক্ষেপ ভালো বলে মনে হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশও অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকেই বলছেন, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, দোষ প্রমাণের দায়িত্ব আদালতের।
রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এই ঘটনায় পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয় এবং মানুষের আস্থা ফেরাতে পুলিশকে কিছু ‘অপ্রিয় কাজ’ করতে হতে পারে। বাংলায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।
কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া কি গ্রহণযোগ্য?
ধর্ষণ ও খুনের মতো অপরাধে দ্রুত তদন্ত, নির্ভুল প্রমাণ সংগ্রহ এবং দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবশ্যই জরুরি। কিন্তু অভিযুক্তের মৃত্যু মানেই মামলার সত্য উদ্ঘাটন নয়। আদালতে সাক্ষ্য -প্রমাণের পরীক্ষা, জেরা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার হওয়ার সুযোগও তাতে শেষ হয়ে যেতে পারে বলে বুদ্ধিজীবীদের মত।
উত্তরপ্রদেশে এনকাউন্টারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে যে আইনগত ও নৈতিক বিতর্ক রয়েছে, গাইঘাটার ঘটনা পশ্চিম বাংলাতেও সেই প্রশ্ন ফিরিয়ে আনছে।



