ঝড়ের মুখে মোদি, ২৫ বছরের ক্ষমতার মুকুটে সংকটের ছায়া?

ক্ষমতার মসনদে ২৫ বছরের পথচলা, সাফল্যের উদ্যাপন এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের এক দীর্ঘ অধ্যায়। তবু সেই মুকুটেই কি জমছে সংকটের ছায়া? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবনের ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে একাধিক চ্যালেঞ্জ ঘিরে ধরেছে তার নেতৃত্বকে। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, বিচারব্যবস্থার ভূমিকায় প্রশ্ন, অর্থনীতির চাপ, বিরোধীদের সক্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির টানাপড়েন সব মিলিয়ে ২০১৪ সালের পর সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে মোদি।
২০০১ সালের অক্টোবরে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে মোদির দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসনপর্ব শুরু হয়েছিল। তার অনুগামীরা এই ২৫ বছরকে সাফল্যের মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু রাজনৈতিক সাফল্যের হিসাবের পাশাপাশি সামনে আসছে একাধিক অস্বস্তিকর প্রশ্নও। বিশেষত, তার তৃতীয় দফার সরকারের তৃতীয় বছরে চাপ ক্রমশ বাড়ছে। সাধারণত কোনও সরকারের মেয়াদের এই পর্যায়ে জন- অসন্তোষ, প্রশাসনিক ক্লান্তি, উত্তরসূরী নিয়ে সমস্যা ও রাজনৈতিক বিরোধিতা বাড়তে পারে। মোদির ক্ষেত্রে উত্তরসূরি নিয়ে বিজেপির অন্দরে প্রকাশ্য আলোচনা না থাকলেও, অন্যান্য চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
মোদির রাজনৈতিক সাফল্যের ভিত্তি ছিল তিনটি স্তম্ভ- হিন্দুত্বনির্ভর জাতীয়তাবাদ, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং দৃশ্যমান পরিকাঠামো নির্মাণ। কিন্তু এই তিনটি ক্ষেত্রেই এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিচ্ছিন্ন সমস্যাগুলি আলাদা করে দেখলে হয়তো সামাল দেওয়া সম্ভব।কিন্তু একাধিক সংকট একসঙ্গে সামনে এলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচন পরিচালনার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের মনে সংশয় বাড়ছে। কমিশনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ। সরকারের বিশ্বস্ত বলে পরিচিত দুই নির্বাচন কমিশনার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজেদের মতপার্থক্য নথিবদ্ধ করে ভবিষ্যতের জন্য অবস্থান সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেছেন। এই ঘটনা কমিশনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
উচ্চতর বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের একাংশের ধারণা, শীর্ষ আদালত নির্বাহী বিভাগের উপর প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশের অবস্থানও স্পষ্ট নয়। আদালতের বক্তব্য ও কাজের মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ধরনের সমালোচনা শুধু বিরোধী শিবির থেকে নয়, রাজনৈতিক পরিসরের বিভিন্ন দিক থেকেই আসছে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়েও আদালতের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং রাজধানীতে প্রতিবাদ করার অধিকার নিয়ে অবস্থান নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালতের ভূমিকা এখন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সিদ্ধান্তে অস্পষ্টতা, অবস্থানের পরিবর্তন এবং লিখিত নির্দেশের বদলে মৌখিক মন্তব্যের উপর বেশি নির্ভরতার প্রবণতা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু রাজনীতিতে নয়, গোটা ব্যবস্থার উপরেই পড়তে পারে।
অর্থনীতি ও রাজনীতির বাড়তি চাপ
জিডিপির পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা, মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা এবং টাকার বিনিময়মূল্যের চাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শেয়ার বাজারের দুর্বলতাও মধ্যবিত্তের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এসআইপির মাধ্যমে বহু মানুষ নিজেদের সঞ্চয় বাজারে বিনিয়োগ করেছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অর্থ সরিয়ে নিলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয়ের উপর চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধীরা বিভিন্ন বিষয়ে সরকারকে আক্রমণ করছেন। ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে দেশের তরুণ প্রজন্ম নিট পরীক্ষা, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সরব। যা নিয়ে দেশে বিদেশে তুমুল আলোচনা চলছে। ইংরেজি টেলিভিশন চ্যানেল থেকে হিন্দি সংবাদপত্র - এমনকি শাসকপক্ষের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সংবাদমাধ্যমেও বিরোধীদের বক্তব্য গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিজেপির শরিকদের মধ্যেও মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। চিরাগ পাসোয়ান বিহারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেছেন। অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশকে একাধিক রাজ্যে ভাগ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শরিক নেতা ওমপ্রকাশ রাজভর। অথচ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন। শরিকদের এমন প্রকাশ্য মন্তব্য শাসক জোটের ভিতরে মতপার্থক্যের বিষয়টি সামনে আনছে।
দেশের বাইরেও স্বস্তি কম
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভারতের জন্য সহজ নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দাবিও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এর পাশাপাশি ইউক্রেনের যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের টানাপড়েন এবং পাকিস্তানের সামনে নতুন কৌশলগত সুবিধা তৈরি হওয়ার বিষয়গুলিও ভারতের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বর্ষার আশঙ্কা। বর্ষার ঘাটতি কোনও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, কিন্তু তার প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে। এ বছর কৃষিক্ষেত্রে গড়ের চেয়ে খারাপ ফলন হলে ইতিমধ্যেই জমে থাকা অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
সংসদে আসন পুনর্বিন্যাস, সাংবিধানিক সংশোধন এবং মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়েও সিদ্ধান্তের স্পষ্টতা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সংবিধান, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে সংবিধান পরিবর্তনের আশঙ্কা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছিল। সংবিধান বহু মানুষের কাছে ন্যায়বিচার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা। সেই বিশ্বাসে আঘাত লাগলে তার রাজনৈতিক অভিঘাতও গভীর হতে পারে।
মোদির ২৫ বছরের রাজনৈতিক যাত্রা নিঃসন্দেহে ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জকে মুছে দিতে পারে না। আগামী দিনে সরকার এই সংকেতগুলিকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে মোদির নেতৃত্বের পরবর্তী অধ্যায়।



