যুক্তরাষ্ট্রের দাদাগিরির সামনে মাথা নোয়াবে না ইরান, দিল্লিতে পেজেশকিয়ান

ব্রিকস সম্মেলনে পেজেশকিয়ানের হাত শক্তভাবে ধরে আছেন নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে ইরান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে দাবি করে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান আত্মসমর্পণ করবে না।
শুক্রবার রাতে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় ধর্মীয় নেতাদের এক সমাবেশে পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘ইরান সফলভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে। তাই দাদাগিরির সামনে আমরা মাথা নত করব না।’
ভারতে ব্রিকস সম্মেলনের জন্য পেজেশকিয়ান বর্তমানে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। এর একদিন আগে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানে সামরিক অভিযান না চালালে ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করে দিত। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতেও হামলা চালাত।
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, ‘আবারও যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়ি, আমি ঠিক একই কাজ করব।’
ভারতে প্রথম সফরে থাকা পেজেশকিয়ান শুক্রবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে মোদি সমুদ্রপথে চলাচলকারী নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নৌ ও বাণিজ্যিক চলাচল স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
ইরান ও ওমানের মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন এখন প্রায় বন্ধের পথে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে বহু জাহাজ ও নাবিক কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে আটকে আছেন।
মোদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ‘আলোচনা ও কূটনীতির’ মাধ্যমে সমাধানের আহ্বানও জানিয়েছেন।
তবে শনিবার ব্রিকস সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে মোদি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে ‘সুবিধাভোগীদের পিরামিড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক পাশ্চাত্যের দেশগুলোর নিজেদের প্রভাবিত করা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ক্ষমতা নেই।
চলতি বছর ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্বে থাকা মোদি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে বৈশ্বিক দক্ষিণের বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন থাকা দরকার।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলতি মাসে লড়াই আরও তীব্র হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ায় ভারতসহ বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো চাপে পড়েছে।
বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতির দেশগুলোর একটি ভারত। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যেও ভারত রয়েছে।
ভারত তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। এর বড় একটি অংশ আসে হরমুজ প্রণালির জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ভারতীয় নাবিকদেরও ক্ষতি হয়েছে। জুলাইয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি জাহাজে হামলা হয়। ওই দুটি জাহাজে মোট ৩০ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। ভারতীয় সরকারের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
শনিবার ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণা দিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ব্রিকসের সব সদস্য এই ঘোষণায় একমত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান ও আমিরাতের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তবে শনিবার সম্মেলনের ফাঁকে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেছেন বলে জানিয়েছে ভারতে ইরানের দূতাবাস।
গত মাসে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তেহরান থেকে তাদের জলসীমার দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল বলে জানানোর পর এই সিদ্ধান্ত নেয় আবুধাবি।
এদিকে শুক্রবার ব্রিকস বিজনেস ফোরাম থেকে বের হওয়ার সময় মোদি ও পেজেশকিয়ানকে হাত ধরে থাকতে দেখা গেছে।
এ সময় ভারতের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের প্রশংসা করেছে দেশটির দূতাবাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তারা বলেছে, ‘দুই মহান দেশের নেতারা যখন হাত মেলান, তখন তারা দুই মহান সভ্যতার ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা মনে করিয়ে দেন।’
সূত্র : সিএনবিসি




