কেন নায়কের সম্মান পান ভারতের কিছু সরকারি কর্মকর্তা?

মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) কমিশনার তুকারাম মুন্ধে। ছবি: রয়টার্স
শুধু দায়িত্বটাই পালন করেন তারা! যতটুকু তার কাজ করেন ততটুকুই। তাতেই নায়ক বনে যান ১৫০ কোটির মানুষের দেশ ভারতে।
রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখতে দেশটিতে কাজ করেন লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা। সবার কপালে অবশ্য এ সম্মান জোটে না। মাত্র কয়েকজন হয়ে ওঠেন নয়নমণি!
তাদেরই একজন তুকারাম মুন্ধে। ৫১ বছর বয়সী এ কর্মকর্তা ভারতের মহারাষ্ট্রের ফুড এবং ওষুধ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কমিশনার। দায়িত্ব নিয়েছেন বেশিদিন হয়, গত মে মাসে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর মুন্ধে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান ও সমৃদ্ধশালী এ রাজ্যের খাদ্য ব্যবসায়ীদের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন নামীদামি রেস্তোরাঁয় একাধিক ভেজালবিরোধী অভিযানের।
কড়া এ সরকারি কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন দল রেস্তোরাঁয় রেস্তোরাঁয় গিয়ে খুঁজে বের করেছেন মেয়াদোত্তীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর এবং জীবাণুযুক্ত খাবার। শুধু তাই নয়, তার দল হানা দিয়েছে হাসপাতালেও। ধরে ফেলেছে তাদের জারিজুরি। তারা কম টাকায় চিকিৎসা পণ্য কিনে বেশি দামে বিক্রি করত রোগীদের কাছে।
সামান্য এ দায়িত্বটুকু পালন করেই মুন্ধে রাতারাতি ভারতে হয়ে উঠেছেন— নায়ক। তার অভিযানের ছবি ও ভিডিওতে সয়লাব হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শুধু কি তাই? লোকে এসব ভিডিওতে কমেন্ট করে লিখছেন— মুন্ধেকে পাঠানো হোক তাদের রাজ্যে। তাকে না হলেও পাঠানো হোক তার মতো কাউকে।
এর কারণও আছে। তা হচ্ছে— দেশটিতে খাদ্যে ভেজাল গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যার একটি। তদারকির অভাবেই এ সমস্যা হয়ে গেছে খাদ্য সিস্টেমের অংশ।
আরএস ভাট। জেলা নগর পরিকল্পনাবিদ। তিনিও নায়ক হয়ে উঠেছেন দিল্লির উপকণ্ঠ গুরুগ্রামে অবৈধ নির্মাণ ও জবরদখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে।
আরএস ভাট বা তুকারাম মুন্ধে পালন করেছেন নিজের দায়িত্বটুকুই। এতেই তারা মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন নায়ক। কিন্তু শুধু দায়িত্ব পালন করেই কেন এসব সরকারি কর্মকর্তা এমন উচ্চতায় পৌঁছালেন তার খোঁজ পেতে ঘেঁটে দেখতে হবে ভারতের সমাজকে। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা এমন অনেক পরিষেবার দায়িত্বে থাকেন যার ওপর মানুষ নির্ভরশীল। এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে— নথিপত্র ইস্যু থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি।
কিন্তু যখনই তাদের দুয়ারে যায় কেউ, দক্ষিণা ছাড়া মেলে না সেবা। ‘হাইকোর্ট দেখানোর’ মাধ্যমে হয়রানি তো আছেই। এ ছাড়া কাজের ধীরগতিতেও বিরক্ত মানুষ।
সুতরাং, সহজেই অনুমেয় কেন আরএস ভাট বা মুন্ধে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। কারণ তারা এমন সরকারি কর্মকর্তা, যারা নিয়েছেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রতা দূর করার উদ্যোগ।
এসব উদ্যোগ স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল, বললেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা কমল কান্ত জাসওয়াল। তার মতে, ‘যা স্বাভাবিক হওয়া উচিত ছিল, তা-ই এখন ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
কেউ তার নিজের কাজ করলে তা ব্যতিক্রম ভাবা শুরু করেছে মানুষ। এর কারণ হিসেবে জাসওয়ালের ভাষ্য, ‘অনেক নাগরিকের কাছেই দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উদাসীন আচরণ এতটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে যে, এখন দক্ষ শাসনব্যবস্থাকেই ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে মনে হয়।’
অবশ্য সরকারি কর্মকর্তাদের নায়ক হওয়ার নজির ভারতে নতুন কিছু নয়। নব্বইয়ের দশকে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষনের কথাই না হয় ধরুন। ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন এ সরকারি কর্মকর্তা। কী করেছিলেন তিনি? বেশি কিছু নয়। পালন করেছিলেন নিজের দায়িত্বটুকু নির্ভীকভাবে।
ভারতের পুলিশ সার্ভিসের কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়া প্রথম নারী কিরণ বেদী। তিনি ১৯৮০ এর দশকের শুরুর দিকে ‘ক্রেন বেদী’ নামে পরিচিতি পান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি অবৈধভাবে পার্ক করা গাড়ি ক্রেন দিয়ে সরানোয় এ নাম জুড়ে যায় তার নামের সঙ্গে।
জমির একটি বিতর্কিত লেনদেনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে ২০১২ সালে অশোক খেমকা পরিচিতি লাভ করেন দেশজুড়ে। অন্যদিকে, ২০২০ সালে দিল্লিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় উন্মত্ত জনতাকে রুখে দাঁড়ানোয় প্রশংসায় ভাসেন পুলিশ কর্মকর্তা নীরজ জাদাউন।
এই গল্পগুলো ‘সৎ’ বা ‘অহেতুক জটিলতাহীন’ আমলার ধারণাটিকে পরিচিত করে তুলেছে। যদিও এ ধরনের চরিত্র বিরল।
জাসওয়ালের দাবি, ভারতে হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা কোনো রকম প্রচারের আলোয় না এসেই তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বললেন,‘তাদের কাজে হয়তো নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি খুব একটা থাকে না। অথবা তাদের কার্যক্রম হয়তো সাধারণের চোখে কম পড়ে।’
সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি সেবাপ্রাপ্তি যেন যুদ্ধজয়ের মতো। দিল্লির বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী রাজেশ সিং। কাজ করেন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। তার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। জানালেন, একটা কাজ শেষ করতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। আর অভিযোগের সুরাহা করার প্রক্রিয়াটি ছিল আরও দীর্ঘ।
‘একটা কাজ হয়তো ২৪ ঘণ্টায় শেষ হতো। কিন্তু আমার তা লেগেছে ছয় মাস পর্যন্ত। তাছাড়া জানতাম না কাজটি ঠিকমতো হবে কি না’, বললেন দিল্লির এ বাসিন্দা।
তবে নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করায় প্রশংসার পাশাপাশি নিন্দাও জোটে। মুন্ধে বা ভাট দুজনেই খাত সংশ্লিষ্টদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। যদিও তারা অস্বীকার করেছেন এসব অভিযোগ। জানিয়েছেন, তারা নিয়ম মেনেই করেছেন সব।
তবে জাসওয়াল এত কঠোর হওয়ার পক্ষে নন। বললেন, আইনের দৃষ্টিতে একজন হকারের দোকান হয়তো একটি অননুমোদিত স্থাপনা। কিন্তু কোনো পরিবারের জন্য তা-ই হতে পারে আয়ের একমাত্র উৎস। আর যে দেশে কাজের সন্ধানে লাখ লাখ মানুষ শহরে পাড়ি জমায়, সেখানে থাকার জায়গা পাওয়ার একমাত্র উপায় হতে পারে কোনো অননুমোদিত আবাসন।
আইন ও অর্থনীতির মধ্যকার এ টানাপড়েন ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে যে, কেন একই ধরনের প্রয়োগমূলক পদক্ষেপকে একই সঙ্গে আইনসম্মত এবং কঠোর—উভয়ভাবেই দেখা যেতে পারে। আবার আমলা দায়িত্ব পালনের সময় নিজেরাও কিছু চ্যালেঞ্জে পড়েন।
স্বল্প সময়ের জন্য সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পুস্পা সুন্দর। তিনি জানালেন, কোনো অন্যায্য দাবি মানতে অস্বীকার করলে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক চাপ ও বদলির মুখে পড়তে হতে পারে। এই কর্মকর্তা বললেন, ‘তাদেরও পরিবার, কর্মজীবন ও আর্থিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। আর স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য এসব বিষয়কে ঝুঁকির মুখে ফেলার মতো প্রয়োজন হয় অসাধারণ সাহসের।’ এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন জাসওয়ালও।
প্রযুক্তির উত্থানও এখন সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে তারা দ্রুত মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারেন। একসময় যেমন কোনো ঘটনায় নির্দিষ্ট শহর বা জেলায় আটকে থাকত; তা এখন মুহূর্তের মধ্যে জেনে যান কোটি কোটি মানুষ। পুস্পা বললেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে প্রায় রাতারাতি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারে।’
মুন্ধের ক্ষেত্রেও আংশিকভাবে এমনটাই ঘটেছে। তার অভিযানের ভিডিওগুলো সাধারণ আইনি প্রয়োগের বিষয়টিকে একটি বহুল-আলোচিত ও দর্শনীয় ঘটনায় পরিণত করেছে।
তবে মুন্ধে বিষয়টি দেখেন ভিন্নভাবে। বিবিসিকে তিনি বললেন, ‘জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি মাথায় রেখেই তিনি এসব পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে চলছে, তাদের ভয়ের কিছু নেই।’
তার মতে, নিয়মকানুন তো আগে থেকেই আছে। তার কাজ সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ।
তবে সাধারণ মানুষের আগ্রহ শুধু একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়। সরকারের মৌলিক কাজগুলো যখন দৃশ্যমানভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা হয়, তখন সেগুলোও অসাধারণ বলে মনে হতে পারে। কেননা, দেশটিতে অনেক মানুষই এর বিপরীত চিত্র দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
সূত্র: বিবিসি






