বিচ্ছিন্নতা থেকে সম্পৃক্ততা
তালেবানের সঙ্গে কি সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে বিশ্ব?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে তালেবানের সঙ্গে- গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে তালেবান। তখন থেকেই মানবাধিকার সম্পর্কিত নানা বিষয় লঙ্ঘনের কারণে বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রে আসে তালেবান সরকার। এ কারণে তাদের আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার নীতি গ্রহণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলোসহ বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র। ধারণা ছিল, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হলে নারী অধিকার, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো বিষয়গুলোতে নীতিগত পরিবর্তন আনতে বাধ্য হবে তালেবান।
তালেবান ক্ষমতা দখলের পর কেটে গেছে প্রায় পাঁচটি বছর। তবে বাস্তবে এই বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে তা নিয়ে এখন ভাবছে বিশ্ব।
পাঁচ বছরে তালেবানের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবুও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও নিরাপত্তা, অভিবাসন, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক বাস্তবতার কারণে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগোচ্ছে তারা। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এখন ‘বিচ্ছিন্নতা’ থেকে ‘সম্পৃক্ততার’ দিকে সরে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক নীতি।
বিচ্ছিন্ন রাখার নীতি কি ব্যর্থ
২০২১ সালের পর পশ্চিমা বিশ্বের মূল কৌশল ছিল ‘চাপ সৃষ্টি’। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না দেওয়া, আফগানিস্তানের বৈদেশিক সম্পদ স্থগিত রাখা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার মাধ্যমে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয় তালেবানকে।
কিন্তু বাস্তবে উল্টো নারীদের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে তালেবান। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে মেয়েদের বাদ দেওয়া, অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিষিদ্ধ করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনে অনীহার অবস্থান থেকে সরে আসেনি তারা।
ফলে অনেক দেশের কাছে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তালেবানের আচরণ পরিবর্তন করতে পারেনি। বরং আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ রাখার ফলে কমে গেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রভাবও।
নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার
নীতিগত মতপার্থক্য থাকলেও নিরাপত্তার প্রশ্নে এখন বাস্তববাদী অবস্থান নিচ্ছে অনেক দেশ। আশঙ্কা রয়েছে, আফগানিস্তানকে উপেক্ষা করলে আইএস-খোরাসান, সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং আন্তঃদেশীয় জঙ্গি নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে।
রাশিয়ার জন্য এটি মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তার প্রশ্ন। চীনের জন্য শিনজিয়াং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।
ফলে তালেবানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এখন অনেক দেশের কাছে আদর্শগত নয়, বরং নিরাপত্তাগত প্রয়োজন।
বদলাচ্ছে ইউরোপের নীতিও
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ইউরোপে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর কাবুলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ করে দেয় ইউরোপীয় দেশগুলো। কিন্তু বর্তমানে ইউরোপে আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত আফগানদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু।
এই বাস্তবতায় চলতি মাসে প্রথমবারের মতো ব্রাসেলসে তালেবান প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সেখানে তালেবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রত্যাবাসন, কনস্যুলার সেবা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন ১৫টি সদস্য দেশের কর্মকর্তারা।
ইইউর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন নোবেলজয়ী অধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই। তার ভাষায়, ‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের জন্য দায়ী একটি শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দিতে পারে না ইউরোপ।’
যদিও ইইউ জোর দিয়ে বলছে, এটি কোনো রাজনৈতিক স্বীকৃতি নয়। ‘ডি ফ্যাক্টো’ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কারিগরি পর্যায়ের সংলাপ। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই বৈঠক ইউরোপের নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত, কারণ ২০২১ সালের পর এটিই ছিল তালেবানকে নিয়ে ব্রাসেলসে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক।
এ ছাড়া আফগানিস্তানে এখনো কোটি কোটি মানুষ খাদ্যসংকট, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে ভুগছে। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে ন্যূনতম সমন্বয় প্রয়োজন হয়। খাদ্য, ওষুধ কিংবা জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে হলে বাস্তবে কাবুলের ক্ষমতাসীন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করা ছাড়া বিকল্প নেই।
এ কারণেও তালেবানের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ বজায় রাখছে অনেক দেশ।
অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির হিসাব
আফগানিস্তান মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থল। চীন দেশটির বিপুল খনিজসম্পদ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্পে আগ্রহী। পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো ট্রানজিট বাণিজ্য বাড়াতে চায়। জ্বালানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ দেখছে রাশিয়া-ভারতও।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানকে ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। ফলে অনেক দেশ মনে করছে, কাবুলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখলে সেই কৌশলগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে তারা।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ডি ফ্যাক্টো সম্পৃক্ততা।
তালেবান এখন আফগানিস্তানের প্রশাসন, সীমান্ত, বিমানবন্দর, কাস্টমস, পুলিশ ও সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। ফলে ভিসা, কনস্যুলার সেবা, বাণিজ্য, নিরাপত্তা কিংবা মানবিক সহায়তা—কার্যত তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হচ্ছে সব ক্ষেত্রেই।
অনেক দেশের মতে, বাস্তবে যে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো কার্যকর নীতি পরিচালনা সম্ভব নয়।
পরিবর্তনের হাওয়া
এই নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিফলন এরই মধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্রাসেলস বৈঠক। তালেবানকে স্বীকৃতি না দিয়েও তাদের প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানানো কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল। এখন অভিবাসন ও প্রত্যাবাসনের মতো বাস্তব ইস্যুতে বদলেছে সেই অবস্থান।
রাশিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে ২০২৫ সালে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
চীন তালেবান মনোনীত রাষ্ট্রদূত গ্রহণ করেছে এবং কাবুলের সঙ্গে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি তারা।
তালেবান মনোনীত রাষ্ট্রদূত গ্রহণ করেছে এবং আফগানিস্তানের বেসামরিক বিমান চলাচল ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বাড়িয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ভারত ২০২১ সালে দূতাবাস কার্যত বন্ধ করলেও পরে কাবুলে কারিগরি মিশন আবার চালু করে, মানবিক সহায়তা পাঠায় এবং তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক শুরু করে। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকলেও দুই পক্ষের যোগাযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি।
স্বীকৃতি এখনো দূরের পথ
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই প্রবণতা সত্ত্বেও অধিকাংশ দেশ এখনো তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।
কারণ নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন না করা এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এখনো বহাল রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাসেলস বৈঠকও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের যোগাযোগ তালেবানকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দিচ্ছে এবং ইউরোপের ঘোষিত মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ব্রাসেলসভিত্তিক নীতিবিশ্লেষক শাগোফাহ গাফোরি মনে করেন, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও ইউরোপ ধীরে ধীরে তালেবানকে ‘স্বাভাবিক’ করছে।
তার ভাষায়, ‘স্বাভাবিকীকরণের জন্য কোনো চুক্তিতে সই করার প্রয়োজন হয় না। ভিসা দেওয়া, বৈঠকের আয়োজন করা এবং ধীরে ধীরে নীতির জায়গায় বাস্তব লেনদেনকে স্থান দেওয়ার মধ্য দিয়েই স্বাভাবিকীকরণ ঘটে।’
পাঁচ বছর আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূল বার্তা ছিল, ‘স্বীকৃতি নয়, যোগাযোগও নয়।’ এখন সেই অবস্থান বদলে হয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘স্বীকৃতি নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় যোগাযোগ।’
অর্থাৎ তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধতা না দিলেও নিরাপত্তা, অভিবাসন, মানবিক সহায়তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটিই এখন আফগানিস্তান নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।






