শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন অস্ট্রেলিয়ার

প্রতীকী ছবি/এআই
নতুন করে আরও কঠোর অভিবাসন বিধি চালু করছে অস্ট্রেলিয়া। এই বিধির আওতায় অধিকাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী এখন আর তাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় আনতে পারবেন না। অভিবাসন কমাতেই আনা হয়েছে এসব বিধিনিষেধ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বৃহস্পতিবার নতুন নিয়মগুলো ঘোষণা করেন। এতে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও আরও কড়াকড়ি করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় আরও বেশি সময় থাকতে চান এমন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সাধারণত একই স্তরের কোর্সের ভিসার মেয়াদ বারবার বাড়ানোর বদলে উচ্চতর যোগ্যতার কোর্সে যেতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ আবাসনসংকটের জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার প্রবণতাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে উত্থান ঘটানো কট্টর ডানপন্থী ওয়ান নেশন পার্টি চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, অস্ট্রেলীয়দের ‘স্বস্তির সুযোগ’ দিতে তিন বছরে অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা ৭ লাখ ৫০ হাজার কমাবে তারা। দলটির নেতা পলিন হ্যানসন কয়েক দশক ধরে অভিবাসনবিরোধী প্রচার চালিয়ে আসছেন।
বার্ক বলেন, অভিবাসন অস্ট্রেলিয়ার জন্য এখনো একটি ‘শক্তি’। তবে এর জন্য ‘উচ্চ মাত্রার নিয়ন্ত্রণ’ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। ওয়ান নেশনের বক্তব্যের কারণে সরকার এসব পরিবর্তন এনেছে, এমন ধারণাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
সাংবাদিকদের বার্ক বলেছেন, ‘এটি সাম্প্রতিক কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নেওয়া পদক্ষেপ, এমন ধারণা করা যে ভুল, তা স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করা যায়। এটি নয়।’
নতুন নিয়মে সব ধরনের ভিজিটর ভিসায় ‘আর থাকা যাবে না’ এমন শর্ত যুক্ত হবে। ফলে এসব ভিসাধারী অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করে পার্টনার ভিসাসহ অন্য কোনো ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন না। তবে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় থাকা ব্যবস্থা অনুযায়ী যুক্তরাজ্যের ওয়ার্কিং হলিডেমেকারদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন প্রযোজ্য হবে না।
অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আর পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসতে পারবেন না। তবে অস্ট্রেলিয়ায় ইতিমধ্যে অবস্থানরত বিদেশি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর নাগরিকদের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বামী-স্ত্রী ও সঙ্গীরা অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করতে পারেন। তবে শিক্ষার্থীর কোর্সের ধরন অনুযায়ী অনুমোদিত কাজের সময় ভিন্ন হয়।
সরকার নতুন কিছু বিধি মেনে চলা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও চালু করবে। এর মধ্যে থাকবে ১০০ জন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ। পাশাপাশি মেলবোর্নের একটি সাবেক কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রকে আটককেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে।
বার্ক বললেন, ‘এটি এমন কোনো ধরনের কার্যক্রম নয়, যা কেউ কেউ টেলিভিশনে অন্য দেশে ঘটতে দেখেছেন।’ তার এই মন্তব্যে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সংস্থার কর্মকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত ছিল।
সরকারের প্রত্যাশা, কঠোর এসব পদক্ষেপের ফলে ২০২৮ সালের মধ্যে বার্ষিক নিট অভিবাসন প্রায় ৩ লাখ থেকে কমে ২ লাখ ২৫ হাজারে নেমে আসবে। অস্ট্রেলীয় ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে এখনো রয়েছে অভিবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়।
যারা মানুষকে বারবার ভিসার ধরন পরিবর্তনে সহায়তা করেন, সেই মাইগ্রেশন এজেন্টদের বিরুদ্ধেও নতুন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বার্ক বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের পর নতুন ভিসার জন্য আবেদনকারীদের প্রায়ই ‘ব্রিজিং ভিসা’ নিয়ে দেশটিতে থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি এটিকে ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন।
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে ৫৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার (২৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন পাউন্ড) অবদান রেখেছে। দেশটির রপ্তানি আয়ের দিক থেকে এটি চতুর্থ বৃহত্তম খাত। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও অভিবাসন কমানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্র-বাম লেবার সরকারের প্রচেষ্টার অন্যতম কেন্দ্রে রয়েছে বিদেশি শিক্ষার্থীরা।
২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ৩ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার ভিসা দেওয়া হয়েছে নির্ভরশীল ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যদের (স্পাউস)। চার বছরে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন ফি প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা এবং গ্র্যাজুয়েট ভিসার আবেদনকারীদের ন্যূনতম সঞ্চয়ের সীমাও কঠোর করা হয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় দুই বছর কোভিড-১৯ বিধিনিষেধের পর অস্ট্রেলিয়া সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর দেশটিতে অভিবাসন দ্রুত বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, ব্যাকপ্যাকার এবং অস্থায়ী কর্মীরাই মূলত এই বৃদ্ধির পেছনে ছিলেন।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট




