যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা উপেক্ষা করে জাতিসংঘে জলবায়ু প্রস্তাব পাস

সংগৃহীত ছবি
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মতামতকে সমর্থন জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে বিপুল ভোটে। ১৪১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, বিপক্ষে ভোট দেয় আটটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, আর কিছু দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য জানায়।
প্রস্তাবটি উত্থাপন করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতু। এতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পরামর্শমূলক মতামতকে জানানো হয় সমর্থন। ওই মতামতে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া রাষ্ট্রগুলোর আইনি দায়িত্ব।
যদিও জাতিসংঘের এই প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশের আদালতও রায় প্রদানে বিবেচনায় নিচ্ছে এটিকে।
ভোটাভুটিতে অংশ নেয়নি ২৮টি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, রাশিয়া, ইসরায়েল, ইরান, ইয়েমেন, লাইবেরিয়া ও বেলারুশ ভোট দেয় প্রস্তাবটির বিপক্ষে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ ১৪১টি দেশ অবস্থান নেয় প্রস্তাবের পক্ষে। কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজক তুরস্ক, ভারত এবং তেল উৎপাদনকারী দেশ কাতার ও নাইজেরিয়া বিরত থাকে ভোটদানে।
ভোটের পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আইসিজের পরামর্শমূলক মতামত সংক্রান্ত সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব গ্রহণকে স্বাগত জানান তিনি।
তার ভাষ্য, এটি আন্তর্জাতিক আইন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, বিজ্ঞান এবং জনগণকে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকট থেকে রক্ষায় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বের একটি শক্তিশালী স্বীকৃতি।
তিনি আরও বলেন, এর মাধ্যমে সরকারগুলো নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকট থেকে রক্ষার দায়বদ্ধতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উপরাষ্ট্রদূত ট্যামি ব্রুস প্রস্তাবটির সমালোচনা করে বলেন, এতে জীবাশ্ম জ্বালানি সংক্রান্ত অনুপযুক্ত রাজনৈতিক দাবি রয়েছে। তিনি জানান, উত্থাপিত আইনি বিষয়গুলো নিয়ে মহাসচিবকে প্রতিবেদন দেওয়ার কোনো ভিত্তি ওয়াশিংটন দেখছে না।
এর আগে এপি জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন প্রস্তাবটি পাস ঠেকাতে কূটনৈতিকভাবে ভানুয়াতুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং অন্যান্য দেশকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা চালায়।
ভানুয়াতুর রাষ্ট্রদূত ওদো তেভি ভোটের আগে বলেন, ‘আমাদের একে অপরের সঙ্গে সৎ থাকা উচিত। ক্ষতিটি বাস্তব, এবং এটি ইতোমধ্যে আমাদের দ্বীপ ও উপকূলজুড়ে পৌঁছে গেছে, যেখানে খরা ও ফসলহানির মুখে পড়ছে বহু সম্প্রদায়।’
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হলেও এসব জনগোষ্ঠীই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।
ভানুয়াতুর জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী রালফ রেগেনভানু বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আইনের শাসনের প্রতি টেকসই প্রতিশ্রুতি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এবং জলবায়ু পরিবর্তন এর বাইরে নয়।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে। তুভালুর গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই মিটার, এবং ধারণা করা হচ্ছে ২১০০ সালের মধ্যে দেশটির বড় অংশ তলিয়ে যেতে পারে জোয়ারের পানিতে। এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু অভিবাসন ভিসার জন্য আবেদন করেছে দেশটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক।
অন্যদিকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ব্যয় মেটাতে বিদেশিদের কাছে পাসপোর্ট বিক্রির মতো পদক্ষেপ নিয়েছে নাউরু, যার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন তহবিলে যুক্ত করা হচ্ছে।
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, সর্বোত্তম পরিস্থিতিতেও এই সীমা অতিক্রমের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।




