নিউ ইয়র্কে কূটনৈতিক তৎপরতা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের বরফ গলবে?

নিউ ইয়র্কে ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে এসেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ছবি: রয়টার্স
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভবিষ্যতে যুদ্ধ ঠেকাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। সেই মঞ্চেই মঙ্গলবার ঠিক তার বিপরীত কাজ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাধারণ পরিষদে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হুমকি দিলেন। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তিনি বললেন, ইরানকে তিনি ‘ধ্বংস করে দিতে’ পারেন।
তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে যোগ দিতে বিশ্বনেতারা এখন নিউ ইয়র্কে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ ঘিরে জাতিসংঘের বাইরে সেখানে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তিন ঘণ্টা ধরে পরোক্ষ আলোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন। ট্রাম্প এই বৈঠককে ‘খুব ভালো’ এবং ‘খুব ফলপ্রসূ’ বলে অভিহিত করেছেন।
একই দিন ট্রাম্প উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠকে অঞ্চলটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে কাতারের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন।
এদিকে বুধবার ভোরে নিউ ইয়র্কে পৌঁছেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে থাকা কোনো দেশের নেতা হিসেবে এই প্রথম তিনি ইউএনজিএর অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখলেন।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং। প্রায় এক দশকের মধ্যে এটাই যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। বুধবার সন্ধ্যায় তার ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর কথা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আলাদা এসব কূটনৈতিক আলোচনার লক্ষ্য মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তেহরানে আল জাজিরার সংবাদদাতা তৌহিদ আসাদির তথ্য অনুযায়ী, আরাগচি ও উইটকফ-কুশনারের বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সর্বশেষ শর্তগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে জুনে চূড়ান্ত হওয়া ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ভেস্তে যাওয়ার পর ইরান এসব নতুন শর্ত দিয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা থাকলেও বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এসব আলোচনা থেকে চলতি সপ্তাহে সরাসরি কোনো চুক্তিতে সম্মত হবে দুই দেশ, এমনটা আশা করা অবাস্তব। সংঘাতের সঙ্গে জড়িত একাধিক পক্ষ ও মধ্যস্থতাকারী সম্ভাব্য সমঝোতার পথ খুঁজছে। কিন্তু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মূল মতবিরোধের বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেছেন, ‘আমি মনে করি না, এই সপ্তাহে কোনো বড় ধরনের সমঝোতা হতে পারে। তবে ধারাবাহিক কিছু সমঝোতা নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার জন্য আস্থা তৈরি করতে পারে।’
বর্তমান পরিস্থিতিকে কূটনৈতিক সমঝোতার উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখছেন না ভাকিল। তার মতে, সময়টা এখনো খুবই শুরুর পর্যায়ে। এর পাশাপাশি অতীতে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘দুই পক্ষ দুই বছরের বেশি সময় ধরে আলোচনা করছে। এর মধ্যে দুই দফায় তা সামরিক সংঘাতে গড়িয়েছে। এখনো সামরিক হুমকির মধ্যেই এই আলোচনা চলছে।’
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ ও চলতি বছরের যুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে তেহরান বলছে, এসব ঘটনা এটাই প্রমাণ করে ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিল থেকে সামরিক পদক্ষেপে চলে যেতে পারে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এমন এক সময় শুরু হয়, যখন ওমানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো আদেল আবদেল গাফার বলেছেন, আলোচনা ফের শুরুর বিষয়ে ‘বাস্তব’ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি ‘অনেকটাই শক্তি প্রদর্শনের’ বিষয়ও রয়েছে। মঙ্গলবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ আলোচনার প্রশংসায় ট্রাম্পের বক্তব্য এবং একই দিনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার আক্রমণাত্মক বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন এ বিশ্লেষক।
তার মতে, সমঝোতা কতটা এগোবে, সেটি নির্ভর করছে নিউ ইয়র্কে থাকা ইরানি কূটনীতিকরা কী করতে পারেন তার ওপর।
আবদেল গাফারের ভাষ্য, ‘আরাগচি ও পেজেশকিয়ান আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু যেকোনো চুক্তির জন্য ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং দেশে যুদ্ধের দায়িত্বে থাকা নেতৃত্বের সম্মতি প্রয়োজন হবে।’
তবে বিশ্লেষকরা একটি বিষয়ে একমত, যে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে উপসাগরীয় দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ দুপক্ষের সঙ্গেই তাদের যোগাযোগের পথ রয়েছে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি থেকে চলা এই সংঘাত বন্ধে স্বার্থ রয়েছে তাদের।
সূত্র: আল জাজিরা





