৮০ বছরে পা দিলেন ট্রাম্প, বার্ধক্যেও কেন কাজ করছেন আমেরিকানরা?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
৯৫ বছর বয়সেও রোগী দেখেন চিকিৎসক আর্থার রোজ। ৯৩ বছর বয়সী আইনজীবী হ্যারিয়েট নিউম্যান কোহেন এখনো হাজির হন আদালতে। এমনকি গড়েছেন নতুন আইন ফার্মও।
আর ৮০ বছরে পা দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রবীণ রাষ্ট্রনেতা।
একসময় কর্মজীবনের শেষ সীমা হিসেবে ধরা হতো ৬৫ বছর বয়সকে। আজ ৬৫ পেরিয়েও নিয়মিত কাজ করছেন প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আমেরিকান। যুক্তরাষ্ট্রে এখন ক্রমশ বাড়ছে এমন মানুষের সংখ্যা।
তবে এটি কি শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন, নাকি কাজের মধ্যেই তারা খুঁজে পান জীবনের অর্থ, উদ্যম ও দীর্ঘায়ুর সূত্র? ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে বয়স, কর্মক্ষমতা এবং বার্ধক্যে সক্রিয় থাকার বাস্তবতা।
৬৫ বছরেরও বেশি সময় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে শেষবারের মতো নিজের অফিসে প্রবেশ করেন চিকিৎসক আর্থার রোজ। ৯৫তম জন্মদিনে অবসর নেওয়াকে নিজের জন্য এক বিশেষ উপহার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্তের পেছনে আংশিক অনুপ্রেরণা ছিলেন তার ভাই। কোভিড মহামারির সময় ৯৫ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
রোজ বলেছেন, ‘কাজটা আর আমাকে আগের মতো আনন্দ দিচ্ছিল না। সেই একই ধরনের উচ্ছ্বাস আর অনুভব করছিলাম না।’
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত অবসরের বয়স ধরা হয় ৬৭ বছর। আর মিশিগানের বাসিন্দা রোজ আমেরিকার ক্রমবর্ধমান সেই জনগোষ্ঠীর অংশ যারা সাধারণ অবসরের বয়স পেরিয়েও কাজ করে যাচ্ছেন।
তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আজ রবিবার পা রাখলেন ৮০ বছরে। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বাধিক বয়স্ক প্রেসিডেন্ট। তার চেয়ে বেশি বয়সে দায়িত্ব পালন করেছেন জো বাইডেন। ৮২ বছর বয়সে হোয়াইট হাউজ ত্যাগ করেন তিনি। পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক রাষ্ট্রনেতাদের অন্যতম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের শেষ পর্যায়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া মোটেও সহজ নয়।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় বর্তমানে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মজীবী মানুষের হার চার গুণ বেড়েছে। এই বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৯ শতাংশ এখনো কর্মরত।
তারা আইনপ্রণেতা, প্রেসিডেন্ট, করপোরেট নির্বাহীসহ দায়িত্ব পালন করছেন নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে। চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ৮০ বছরের বেশি বয়সী সদস্যের সংখ্যা ছিল ২৪ জন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ হলেন ৯২ বছর বয়সী সিনেটর চাক গ্রাসলে।
বার্ধক্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে উৎসাহিত করছে। প্রথমত, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির কারণে আগের চেয়ে বেশি মানুষ ৮০ বছর বা তারও বেশি বয়স পর্যন্ত সুস্থভাবে বেঁচে থাকছেন।
অনেকের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রয়োজনও একটি বড় কারণ। জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় আবার কাজে ফিরতে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি। চাকরি অনুসন্ধান প্ল্যাটফর্ম ইনডিড ফ্লেক্সের এক জরিপে দেখা গেছে, খণ্ডকালীন বা অস্থায়ী কাজের কথা ভাবছেন প্রায় ৩০ শতাংশ অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তাদের ৬০ শতাংশের বেশি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে প্রায় অর্ধেক মানুষ বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখার ইচ্ছাও তাদের কাজে ফেরার অন্যতম কারণ।
বয়স নিয়ে বদলে যাচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি
বার্ধক্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক গর্ডন লিথগোর মতে, বয়স সম্পর্কে বদলাচ্ছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও।
তিনি বলেছেন, ‘আমি আশা করি মানুষ এখন ভাবতে শুরু করেছে যে কোনো কাজের জন্য যোগ্যতাই আসল বিষয়, বয়স নয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মানুষ সত্তরের দশক এমনকি আশির দশকেও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।’
৯৩ বছর বয়সী বিবাহবিচ্ছেদবিষয়ক আইনজীবী হ্যারিয়েট নিউম্যান কোহেন এখনো আদালতে কাজ করেন। সম্প্রতি তিনি একটি স্মৃতিকথাও প্রকাশ করেছেন।
কোহেন বলেছেন, ‘কাজ আমাকে তরুণ, প্রাণবন্ত, উদ্যমী, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও আনন্দময় রেখেছে। আমি অন্য কোনোভাবে জীবন কাটানোর কথা কল্পনাও করতে পারি না।’
সাবেক নিউ ইয়র্ক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোসহ বিভিন্ন খ্যাতিমান ব্যক্তির বিবাহবিচ্ছেদ মামলায় আইনগত সহায়তা দিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ
যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে অভিজ্ঞতাও বাড়ে, তবে অনেকে মনে করেন স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মানসিক সক্ষমতার অবনতি কিংবা শারীরিক শক্তি কমে যাওয়া কর্মজীবনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বয়সজনিত বিষয়ই শেষপর্যন্ত ২০২৪ সালের নির্বাচনে পুনর্নির্বাচনের লড়াই থেকে বাইডেনের সরে দাঁড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি বিতর্কে দুর্বল পারফরম্যান্সের পর ডেমোক্র্যাট দলের অনেক নেতা তার মানসিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
অন্যদিকে ট্রাম্পের বয়স ৮০ হতে যাওয়ায় তার স্বাস্থ্যের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কিছু আইনপ্রণেতা ও সাধারণ নাগরিক।
সম্প্রতি এক কংগ্রেসীয় শুনানিতে ডেমোক্র্যাট সদস্য টেড লিউ কয়েকটি ভিডিও প্রদর্শন করে দাবি করেন, সেখানে বিভিন্ন বৈঠকে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় দেখা গেছে ট্রাম্পকে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই অভিযোগকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি কখনো ট্রাম্পকে জনসমক্ষে ঘুমিয়ে পড়তে দেখিনি। বরং সমস্যাটা হলো, তিনি ঘুমানই না।’
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার হাতে নিয়মিত দেখা যাওয়া কালশিটে দাগের কারণ হলো ঘন ঘন করমর্দন এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে অ্যাসপিরিন সেবনের ফলে সৃষ্ট সামান্য নরম টিস্যুর জ্বালার ফল।
দুই সপ্তাহ আগে ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে চিকিৎসক ক্যাপ্টেন শন বারবাবেলা জানালেন, প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য ‘চমৎকার’।
তার ভাষায়, ‘একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডসহ প্রেসিডেন্টের ব্যস্ত দৈনন্দিন সূচি তার সার্বিক সুস্থতাকে সমর্থন করছে।’
দীর্ঘায়ুর রহস্য কী?
লিথগোর মতে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম বয়স্ক কর্মজীবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মানুষের কোষীয় কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে এবং বার্ধক্যের গতি বাড়িয়ে দেয়।
তিনি বলেছেন, ‘এটি প্রকৃত জৈবিক চাপ, যা বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করে। প্রতিদিনের দীর্ঘস্থায়ী চাপ মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।’
তার মতে, পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের মেরামত ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে।
কোহেন জানান, দীর্ঘায়ুর অন্যতম রহস্য হলো প্রতিদিন আট ঘণ্টার বেশি ঘুম, পাশাপাশি নিয়মিত বই পড়া এবং মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা।
৮৮ বছর বয়সে মেয়ের সঙ্গে নতুন একটি আইন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তার মতে, কাজ জীবনে একটি লক্ষ্য ও অর্থবোধ এনে দেয়।
একই অনুভূতি কাজ করেছিল চিকিৎসক রোজের মধ্যেও। রোগীদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কই তাকে এত বছর কাজ চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।
অনেক রোগী কিশোর বয়সে আমার কাছে আসতে শুরু করেছিল, আর ৫০ বছর পরও তারা আমার কাছেই আসত। এতে মনে হয়, আমি বুঝি খুব খারাপ চিকিৎসক ছিলাম,’ বলে হাস্যরস করেন তিনি।
রোজের ভাষায়, ‘আমার মনে হতো রোগীরা এবং সমাজ একজন চিকিৎসক হিসেবে আমাকে প্রয়োজন মনে করে। সম্ভবত আমি ভাবতাম, আমাকে ছাড়া কেউ চলতে পারবে না।’
লিথগোর মতে, জীবনের লক্ষ্যবোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম বার্ধক্য প্রতিরোধে সহায়ক।
তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে আর্থিক সামর্থ্য, প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা। তার মতে, জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
তিনি বলেছেন, ‘যদি আপনার সেরা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সামর্থ্য থাকে, তাহলে আপনি এরমধ্যেই অধিকাংশ মানুষের তুলনায় অনেক এগিয়ে আছেন।’
বর্তমানে ৯৫ বছর বয়সেও সুস্থ আছেন আর্থার রোজ। তবে দীর্ঘায়ুর রহস্য সম্পর্কে তার নিজের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
তিনি বলেছেন, ‘আমি সত্যিই জানি না কী করেছি। আমি ধূমপান করি না। মাঝে মাঝে একটু শ্ন্যাপস পান করি।’
রোজ জানান, তার অধিকাংশ রোগী তার প্রকৃত বয়স জানতেন না, কিংবা জানলেও গুরুত্ব দিতেন না। তবে কেউ কেউ যখন জানতে পারতেন যে তাদের চিকিৎসকের বয়স ৯৫ বছর, তখন বিস্মিত হতেন।
হাসতে হাসতে তিনি বলেছেন, ‘কারণ আমি তো বুড়োই হইনি। আমার চেহারায় তেমন কোনো পরিবর্তনই আসেনি।’
সূত্র: বিবিসি




