গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশে নীতিমালা চায় শিল্পখাত

টুথপেস্টসহ বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে কোনো বেসরকারি সংস্থা গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা এবং বিষয়টি যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে এ ধরনের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিএসটিআইর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক গণশুনানিতে বক্তারা এসব দাবি জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএসটিআইর মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. সাইফুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন বিএসটিআইর পরিচালক (প্রশাসন) মো. সাইফুল ইসলাম।
গণশুনানিতে বিএসটিআইর মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, ‘আমরা প্রতিটি গবেষণাকে মূল্যায়ন করি এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি। আমরা চাই দেশে বিভিন্ন বিষয়ে উন্নতমানের গবেষণা হোক। মানসম্পন্ন গবেষণা জাতিকে দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে, জনমনে আতঙ্ক বা অস্থিরতা তৈরি হয়, এমন কিছু যেন না হয়। টুথপেস্ট নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে, তার ফলাফল প্রকাশের আগে রেগুলেটরি বডি হিসেবে বিএসটিআইকে অবহিত করলে নিঃসন্দেহে ভালো হতো।’
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সারা পৃথিবীর কোনো স্ট্যান্ডার্ডে এর মাত্রা নির্ধারণ করা নেই। এ বিষয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। তারা আইএসওসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক মান যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
স্কয়ার গ্রুপের লিগ্যাল অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সিনিয়র লিগ্যাল কাউন্সেল মো. সোহেল হোসেন বলেন, টুথপেস্ট বিএসটিআইর বাধ্যতামূলক মানসনদের অন্তর্ভুক্ত একটি পণ্য। তাই কোনো বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে গবেষণার ফল প্রকাশের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআইর সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। তার ভাষ্য, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফলাফল সব সময় সঠিক বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আগে বিষয়টি আলোচনা বা যাচাই করা হলে বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব। তা না হলে জনমনে বিভ্রান্তির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় ধরনের সুনামহানি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের আন্তর্জাতিক বিপণন বিভাগের উপদেষ্টা মো. শফিকুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সম্প্রতি একটি সংস্থা কয়েকটি বেকারি পণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট পাওয়ার দাবি করেছিল, যা দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু পরে বিএসটিআইর অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরি এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোতে ওই উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তার মতে, নেতিবাচক প্রচারের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের যে সুনামহানি হওয়ার, তা হয়ে গেছে এবং ভোক্তাদের মনেও পণ্যগুলো সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, যা ব্যবসার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
আলোচনায় অংশ নেওয়া শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা বলেন, অসম্পূর্ণ বা যাচাইবিহীন তথ্য প্রকাশের ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা বা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ তৈরি হয়। এতে ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের বাজার ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ গবেষণার দায় ব্যবসায়ীদের বহন করতে হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তারা আরও বলেন, ভোক্তা সুরক্ষার পাশাপাশি শিল্পখাতের স্বার্থ রক্ষায় গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
গণশুনানিতে বিএসটিআইর সেবা সহজীকরণ নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় অনলাইন পেমেন্ট চালু, সব ধরনের আবেদন ও প্রয়োজনীয় নথি অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ, নতুন পণ্যের পাশাপাশি লাইসেন্স নবায়নের আবেদনও অনলাইনে গ্রহণ, ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য গ্রোয়িং-আপ মিল্কের বাংলাদেশ মান প্রণয়ন এবং মোড়কজাত পণ্যের আইন ও বিধিমালার কয়েকটি ধারা সময়োপযোগী করার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, নেসলে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, ট্রান্সকম কনজ্যুমার প্রোডাক্টস, আকিজ রিসোর্স, নিউজিল্যান্ড ডেইরি বাংলাদেশ, এসিআই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, মেরিকো বাংলাদেশ, মেঘনা গ্রুপ, রেকিট, আরলা ফুডস বাংলাদেশ, ইফাদ গ্রুপ, নাবিস্কো বিস্কিট ও মেগা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।




