পুতিন যেভাবে হয়ে উঠলেন ছবির জাদুকর

ভ্লাদিমির পুতিন- রয়টার্স
রুশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শাসনকাল জুড়েই দৃশ্যমান ছবির ক্ষমতার ব্যাপারে দারুণ সচেতন ছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। এমনকি ছবি তোলার সময় ফ্রেমে কোনো পানির গ্লাস থাকলেও তা সরিয়ে নেওয়া হতো। কেউ যেন পানির গ্লাসগুলোকে ভদকার গ্লাস না ভাবতে পারে এমন সূক্ষ্ম বিষয় নিয়েও সচেতন পুতিনের সহকারী।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার পোমেরান্তসেভের মতে, রাশিয়ার প্রত্যেকেই, বিশেষ করে পুতিন বুঝতে পেরেছিলেন ক্ষমতার একত্রীকরণের মূল চাবিকাঠি ছিল টেলিভিশন।
বছরের পর বছর ধরে পুতিন রাশিয়াকে ভঙ্গুর উদীয়মান গণতন্ত্র থেকে বৃহৎ স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি নিজে। সেই সঙ্গে তিনি নাটকীয়ভাবে নিজের রূপান্তর ঘটিয়েছেন।
শুরুর দিকের ছবিগুলোতে তাকে একজন ক্ষীণকায় ও স্বল্পভাষী মানুষ হিসেবে দেখা যায়। ক্যামেরার সামনে বেশ সতর্ক ছিলেন তিনি। তাহলে কীভাবে শান্ত, নিভৃতচারী শিশু এবং প্রচারবিমুখ আমলা এমন এক প্রেসিডেন্টে পরিণত হলেন যে কিনা এভাবে লাইমলাইট বা প্রচারের আলো লুফে নিল?
টেলিভিশনের সৃষ্টি
ক্ষমতায় আসার অনেক আগেই ছবির বা দৃশ্যের ক্ষমতার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল পুতিনের। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে বেড়ে ওঠা অন্য দশটা কিশোরের মতো পুতিনও ছিলেন টেলিভিশন যুগের সন্তান। তার আদর্শ ছিল তৎকালীন জনপ্রিয় সোভিয়েত টিভি সিরিজ এবং চলচ্চিত্রের গুপ্তচর নায়কেরা। নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারেই, সোভিয়েত রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা দৃঢ় ও নীরব ডাবল এজেন্টরাই ছিল পুতিনের কেজিবিতে ক্যারিয়ার গড়ার অনুপ্রেরণা।
একজন কেজিবি কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে পরিশ্রমী সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সবসময় আড়ালে থাকতেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে যখন তিনি আকস্মিকভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে চলে আসেন এবং এর কয়েক মাস পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন তিনি ও তার জনসংযোগ উপদেষ্টারা রাষ্ট্রনায়কের মতো ব্যক্তিত্ব তৈরিতে দৃশ্যমান ছবির গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন।
এই ইমেজ বা ভাবমূর্তি তৈরির প্রক্রিয়ার একটি অংশ ছিল ক্ষতিকর বিষয়গুলো বাদ দেওয়া। ফলে পুতিনকে উপস্থাপন করা হয়েছিল নন-অ্যালকোহলিক ব্যক্তি হিসেবে। ‘ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবে’ পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বার্ষিক বৈঠকের অতিথিদের যখন দামি ওয়াইন পরিবেশন করা হতো, পুতিন তখন মধু দিয়ে এক কাপ চা খেতেন।
তিনি যখন সত্যিই কখনো মদ্যপান করতেন, তার প্রহরীরা তা গোপন রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। এই পরিকল্পনার আরেকটি অংশ ছিল জনগণের মনে এই বার্তাটি গেঁথে দেওয়া যে, তিনি তার পূর্বসূরি বরিস ইয়েলৎসিনের মতো নন। জনসমক্ষে মাতলামি করে রুশদের হতাশ ও বিব্রত করেছিলেন ইয়েলৎসিন।
পুতিন ফাইটার জেট চালানোর জন্য পাইলটের হেলমেট পরলেন। জুডোতে তার দক্ষতা প্রদর্শন করা হলো। এসবের উদ্দেশ্য ছিল একটাই— জনগণকে বোঝানো এই ব্যক্তি একজন উদ্যমী, সুস্থ ও কর্মঠ মানুষ। অসুস্থ মাতাল নন।
সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২০০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া তার একগুচ্ছ ছবি। যেখানে তাকে উন্মুক্ত বক্ষে রাশিয়ান মার্লবোরো ম্যানের মতো ঘোড়ায় চড়তে, নদীতে ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে বা সাঁতারে পেশি প্রদর্শন করতে দেখা গেছে।
এগুলো কি বাস্তব ছিল? নাকি এই ছবিগুলোর পেছনে এক ধরনের চতুর রসিকতা ছিল? পোমেরান্তসেভ মনে করেন, তার জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা খুব ভালো করেই জানতেন তারা কী করছেন।
‘এক শ্রেণির দর্শকের কাছে এটি অত্যন্ত স্থূল মনে হতে পারে। তবে আমরা কাজটি ব্যঙ্গাত্মক উপায়ে করতে যাচ্ছি যেন বেশ আকর্ষণীয় দেখায়। আবার অন্য শ্রেণির দর্শকের কাছে বার্তাটি ছিল এমন, রাশিয়ার নেতৃত্ব দেওয়া উচিত একজন ঐতিহ্যবাহী কঠোর মনের নায়কের।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘পুতিন মূলত ঐতিহ্যবাহী এক সোভিয়েত নেতার ভূমিকা পালন করছিলেন। তবে তিনি এমনটা করেছেন রিয়েলিটি শো, এমটিভি এবং সুগার ড্যাডির যুগে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের রাশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও উপদেষ্টা ফিওনা হিল বললেন, ‘পুতিন হলেন ট্রেন্ড পরিবর্তনকারী। তিনি একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পপ্যুলিস্ট প্রেসিডেন্ট এবং প্রথম প্রশংসিত একনায়কের ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন।’
নিশ্চিতভাবেই, পুতিন ভিন্ন ভিন্ন দর্শককে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দিচ্ছিলেন। বাইরের বিশ্বের কাছে বার্তাটি ছিল রাশিয়া আর দুর্বল নয়, বরং এটি এমন এক শক্তি যাকে সমীহ করতে হবে। তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, এটি এমন এক ভাল্লুক যার দাঁত ও নখ আছে।
এছাড়াও কৃষ্ণসাগরের তলদেশে আগে থেকে রেখে দেওয়া প্রাচীন নিদর্শন ‘আবিষ্কার’ করতে স্কুবা ডাইভিং করা; বিলুপ্তপ্রায় সারস পাখিদের পাশে আকাশে উড়ার জন্য মোটরাইজড হ্যাং গ্লাইডারে চড়ে বসা; এবং সাইবেরিয়ান বাঘের বাচ্চাকে আদর করার মতো কর্মকাণ্ডও তিনি করেছেন।
পুতিন নিজে দাবি করেছিলেন, এসবের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশগত এবং বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
পুতিনের শুরুর দিকের ছবিগুলো, যেমন ১৯৮৫ সালের স্টাসির (পূর্ব জার্মানির গোপন পুলিশ) পরিচয়পত্রের ছবিটি তার মুখোশের আড়ালে একটি ইস্পাতকঠিন সংকল্পের ইঙ্গিত দেয়। এই ইচ্ছাকৃত নীরবতা ও গোপনীয়তা নিঃসন্দেহে কেজিবির ভূমিকার জন্য উপযুক্ত ছিল এবং কেজিবির প্রশিক্ষণেই তা আরও শাণিত হয়েছিল।
১৯৯১ সালের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি নিজেকে আনুগত্য ও দক্ষতাসম্পন্ন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পুনর্গঠিত করেন। শুরুতে সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়রের অধীনে এবং পরে মস্কোয় স্থানান্তরিত হয়ে ইয়েলৎসিনের প্রেসিডেন্ট প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ের ছবিগুলোতে তিনি সাধারণত পেছনের সারিতে বা এক পাশে থাকতেন। কখনোই ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকাতেন না। মূল কেন্দ্রেও থাকতেন না।
সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের নাতির মেয়ে নিনা ক্রুশ্চেভা জানান, ১৯৯০-এর দশকে তাকে বলা হয়েছিল কেজিবি মহলে পুতিন ‘দ্য মথ’ (পতঙ্গ) নামে পরিচিত ছিলেন। এমন এক মানুষ যিনি নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো জায়গায় লুকিয়ে পড়তে পারেন।
কিন্তু যখন প্রেসিডেন্ট হলেন, গল্পটি বদলে গেল। তিনি যেন বিভিন্ন ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ লুফে নিলেন।
কয়েক বছর পর, ২০০৭ সালে যখন টাইম ম্যাগাজিনের পার্সন অব দ্য ইয়ার পুরস্কারের জন্য তার ছবি তোলা হয়, তখন তিনি স্বভাবসুলভভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে ক্যামেরার লেন্সের দিকে এমনভাবে তাকান যেন সিংহাসনে বসা কোনো জার বা ভয়ঙ্কর মাফিয়া ডন।
টাইম ম্যাগাজিনের সেই আলোকচিত্রী প্লেটন বললেন, ‘তিনি আমার সামনে ক্ষমতার অভিনয় করছিলেন। আমি যতটুকু জানি, পুতিন এই ছবিগুলো খুব পছন্দ করেন। তার অনেক সমর্থকও এই ছবিগুলো পছন্দ করেন। এগুলো তাকে একজন কট্টর জাতীয়তাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করে।’
পোমেরান্তসেভের মতে এটি স্বৈরতান্ত্রিক প্রচারণার একটি পোস্টমডার্ন সংস্করণ। যেখানে পুতিন একজন অভিনয়শিল্পীর মতো সমস্ত চরিত্রে অভিনয় করছিলেন।
মুখোশের আড়ালের মানুষ
তার উম্মুক্ত খালি গায়ের ছবিগুলো দীর্ঘ সময় ধরে আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু সম্ভবত এই ছবিগুলো তার নিরাপত্তাহীনতার কথাও বলে।
২০০৮ সালের পর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে এসে চার বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন পুতিন। তখন এই ধরনের মনোযোগ আকর্ষণকারী ছবিগুলো এই বার্তাও দিচ্ছিল প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ নন, বরং তিনিই দেশের আসল ক্ষমতার উৎস।
২০১১ সালে একটি নাটকীয় পরিবর্তন আসে। যা তার রাজনৈতিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়। তিনি হঠাৎ করেই জনসমক্ষে আরও ভরাট, ফোলা এবং ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে হাজির হন। এটি ছিল বেশ রহস্যময়। এটি কি কোনো অসুস্থতার কারণে স্টেরয়েড নেওয়ার লক্ষণ ছিল? নাকি বার্ধক্যের ছাপ দূর করার জন্য তিনি বোটক্সের আশ্রয় নিয়েছিলেন?
কয়েক মাস পরে তিনি আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। ফলাফল নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। তবে বিজয় ঘোষণার উন্মুক্ত সমাবেশে তার সেই নতুন মুখে অশ্রুধারা দেখা গিয়েছিল।
আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম যে সেই কান্নাটি ছিল প্রকৃত। তার কণ্ঠস্বরও আবেগে বুজে আসছিল। নির্বাচনের আগে ব্যাপক বিক্ষোভ হওয়া সত্ত্বেও সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলায় এটি ছিল এক ধরনের স্বস্তির প্রকাশ। কারণ বিক্ষোভকারীরা আশ্চর্যজনকভাবে তার পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান তোলার সাহস দেখিয়েছিল। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন এটি ছিল আরেকটি সাজানো অভিনয়। যা কোনো ক্রন্দনরত ধর্মীয় মূর্তির মতো আবহ তৈরি করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। যাতে ইঙ্গিত দেওয়া যায় যে তিনি এখন রাশিয়ার পবিত্র ত্রাণকর্তা।
বছরের পর বছর ধরে দেশের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হচ্ছিল। এই যুগ থেকে যেকোনো ধরনের জনবিক্ষোভ বা ভিন্নমত কেবল নিরুৎসাহিতই করা হয়নি, বরং পুরোপুরি অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। পুতিন দিন দিন আরও বেশি স্বৈরাচারী হয়ে উঠছিলেন। বিরোধীদের প্রতি আরও কট্টর হতে শুরু মস্কো।
এখন ৭৩ বছর বয়সে এসেও পুতিন ১৯৯৯ সালের মতোই। ক্ষমতার লাগাম ছাড়ার কোনো লক্ষ্মণ নেই। তবে তাকে এখন জনসমক্ষে কম দেখা যায়।
অনেকের ধারণা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ এবং কোভিড মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর থেকে তিনি আরও বেশি প্যারানয়েড হয়ে উঠেছেন। যখনই তিনি ক্যামেরার সামনে আসেন, সেই আয়োজনগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হয়। যেন তিনি বাইরের বিশ্ব থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।
ইউক্রেন যুদ্ধ এখন তার ইমেজের কেন্দ্রবিন্দু। অভিজ্ঞ রুশ সাংবাদিক মিখাইল ফিশম্যানের মতে, ‘২০১২ সালে ক্রেমলিনে ফিরে আসার পর পুতিনের দিকে তাকালে দেখা যেত, তিনি তখনও জানতেন না তিনি আসলে কী বা তার উদ্দেশ্য কী। তবে তিনি বিশ্বাস করেন অবশেষে তিনি তার মিশন বা লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছেন। তিনি তার ভূমিকা খুঁজে পেয়েছেন। সেটি হলো যুদ্ধ।’









