যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি
যুদ্ধের আগুন এবার মিত্রতার ঘরে

সৌদির সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে রিয়াদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা না দেওয়ার হুমকি দেয় ওয়াশিংটন- রয়টার্স
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় সৌদি আরবে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটি থেকে নিজেদের কিছু সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ও বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে তিক্ত হয়ে উঠেছে। তার এই মন্তব্য বুধবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের (ডব্লিউএসজে) প্রকাশিত প্রতিবেদনের আংশিক সত্যতা নিশ্চিত করে।
ডব্লিউএসজের প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে এনে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি অভিযান শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি।
সৌদি আরবের এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে হোয়াইট হাউজ রিয়াদের জন্য নির্ধারিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইন্টারসেপ্টর) সরবরাহ আটকে দেওয়ার হুমকি দেয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সৌদি আরব এসব ব্যবস্থা ব্যবহার করছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে ডব্লিউএসজে।
পরে সৌদি আরব অবস্থান পরিবর্তন করলে গোপনে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আবার শুরু হয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ততক্ষণে দুই দেশের সম্পর্কে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
ডব্লিউএসজের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন সৌদি আরবে তাদের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় অঞ্চল সফর করেন। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফর করলেও সৌদি আরব সফর করেননি। ডব্লিউএসজের মতে, রিয়াদ এটিকে অবজ্ঞাসূচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে।
এর এক সপ্তাহ আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো ডব্লিউএসজেকে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানের প্রতিবাদ জানাতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব ট্রাম্পকে সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার জন্য জোরালোভাবে অনুরোধ করেছিল। রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা সফল হবে না। বরং তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ট্রাম্প সেই উদ্বেগ উপেক্ষা করে যুদ্ধ শুরু করেন। আরব কর্মকর্তাদের মতে, এতে সৌদি আরবের এই ধারণা আরও জোরালো হয় যে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুললেও মার্কিন নীতিনির্ধারণে রিয়াদের বাস্তব প্রভাব খুবই সীমিত।
শুরুর দিকে অনীহা থাকলেও পরে সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়। কারণ ইরানের পাল্টা হামলার সবচেয়ে বড় চাপ তাদেরই বহন করতে হচ্ছিল।
মার্কিন কর্মকর্তা ও উপসাগরীয় অঞ্চলের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব নিজেও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল লক্ষ্য করে কয়েকটি হামলা চালায়।
এরপর ইরান সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাসহ বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে সক্রিয় তৎপরতা শুরু করে রিয়াদ।
ইরানের বিরুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধারাবাহিক হামলা নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিল সৌদি আরব। রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, এতে অঞ্চলটির জ্বালানি স্থাপনাগুলো আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের (ডব্লিউএসজে) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র যেন সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হামলা বন্ধ করতে চাপ দেয় এবং যুদ্ধ অবসানে আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগে যোগ দিতে উৎসাহিত করে।
ইরানের বিরুদ্ধে আবুধাবির কঠোর অবস্থান গত এক বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। চলতি বছরের এপ্রিলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক থেকে বেরিয়ে যায়।
যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বানও জানায়। তবে গত মাসে একটি সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।
বুধবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, তিনি মনে করেন এই সময়সীমা প্রয়োজনে বাড়ানো যেতে পারে।
সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনায় ইসরায়েলের কোনো ভূমিকা ছিল না। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তবে স্মারকের প্রথম ধারায় যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং আবার যুদ্ধ শুরু না করার যে অঙ্গীকার রয়েছে, তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ‘তাদের মিত্রদের’ জন্য বাধ্যতামূলক।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই চুক্তির শর্তগুলোর তীব্র বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, এতে যুদ্ধের প্রধান কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং দেশটির বর্তমান সরকার পতনের পরিবেশ সৃষ্টি—এই দুটি উদ্দেশ্যের কোনো সমাধান এতে নেই।







