ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশ জুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই। মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও একজন মারা গেছে। এ নিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯-এ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে, পাঁচজন। এই বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৮৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এই অধিদপ্তর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতদের বয়সভিত্তিক হিসাব রাখে। তাদের তথ্য বলছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৭৫ জন, মৃত্যু একজনের। ঢাকা বিভাগের দুই সিটিতে আক্রান্ত ১ হাজার ৪২৮ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১ হাজার ১৬৭ জন, মৃত্যু তিন। খুলনা বিভাগে ৭২৫ আক্রান্ত, মৃত্যু হয়েছে একজনের। রাজশাহী বিভাগে ২২২ আক্রান্ত, মৃত্যু হয়েছে একজনের। রংপুর বিভাগে ৩২ জন ও সিলেট বিভাগে ৬০ জন আক্রান্ত হলেও কোনো মৃত্যুর ঘটনা নেই।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, ময়মনসিংহ বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দেশে সবচেয়ে বেশি।
ময়মনসিংহ ছাড়া সব বিভাগেই মৃত্যুহার একের নিচে। এর কারণ হিসেবে বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বললেন, ‘তদন্ত ছাড়া সঠিক কারণ বলা কঠিন। তবে ময়মনসিংহ বিভাগে হাওরসহ কিছু দুর্গম এলাকা রয়েছে। সেসব জায়গায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা কেমন, এসব রোগীরা কোন এলাকার, তারা কখন হাসপাতালে গিয়েছে— সেসব তথ্য পেলে সঠিক কারণ উঠে আসবে।’
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলছেন, ময়মনসিংহ বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম। সে কারণে সেখানে প্রচারণা ও মানুষের মধ্যে সচেতনতাও কম থাকার কথা। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সারা দেশেই মানুষকে সচেতন করতে হবে। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসাইন আগামীর সময়কে বললেন, ‘এই বিভাগে মৃত্যুহার কেন বেশি, তাৎক্ষণিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে তারা ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্য রোগেও ভুগছিল।’ অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিলিটি স্ট্যাটাস সার্ভে’র তথ্য বলছে, দেশে প্রতি হাজারে ৩৩২ জন মানুষ রোগাক্রান্ত। বিভাগ হিসেবে রোগাক্রান্ত মানুষের হার সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহে, প্রতি হাজারে ৩৬৪ দশমিক ১ জন। ১০ হাজার ৬৬৮ বর্গকিলোমিটারের ময়মনসিংহ বিভাগে চারটি জেলা রয়েছে। ময়মনসিংহ জেলার সিভিল সার্জন ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ জেলায় গত ছয় মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২১ জন, মারা গেছে একজন। বাকিরা অন্য জেলার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১৬৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। আর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ২৬৭ ব্যক্তি। আক্রান্তের বেশিরভাগই তরুণ, কম বয়সীদের সংখ্যাও উল্লেযোগ্য।
দেশে বিগত কয়েক বছর ধরেই বর্ষা মৌসুম এলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। জুন থেকেই ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করে। ডেঙ্গু সবচেয়ে বেশি দেখা যায় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে বর্ষাকাল প্রলম্বিত হলে অক্টোবর-নভেম্বরেও ডেঙ্গু রোগীর দেখা মেলে, মৃত্যুর ঘটনাও থাকে। এ সময় বৃষ্টির পানি ছোট ছোট নালা, গর্তে জমে মশার প্রজনন বেড়ে যায়।
চলতি বছরের জুন মাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। জুলাই মাসে আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা জনস্বাস্থ্যবিদদের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা ও মশার লার্ভা খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করতে হবে। কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে ঘরের ভেতরে কোথাও পানি জমার ব্যবস্থা থাকলে সেসব ফেলে দিতে হবে। একই সঙ্গে রোগী খুঁেজও সেই এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মৃত্যুহার কমাতে বিভাগীয় হাসপাতালের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা রাখতে হবে।




