আগামীর সময়

কার স্বার্থে এই যুদ্ধ নিজেকে প্রশ্ন করুন, মার্কিনিদের ইরানি প্রেসিডেন্ট

কার স্বার্থে এই যুদ্ধ নিজেকে প্রশ্ন করুন, মার্কিনিদের ইরানি প্রেসিডেন্ট

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী কি-না এমন প্রশ্ন তুলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে কেবল ‘ইসরায়েলের প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করছে।

তেহরানের ওপর ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনীর যৌথ হামলার এক মাস পূর্তির প্রেক্ষাপটে আমেরিকান জনগণের উদ্দেশে খোলা চিঠি লেখেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। চিঠিটি বুধবার (১ এপ্রিল) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’ প্রকাশ করেছে। এতে তিনি মার্কিন নাগরিকদের যুদ্ধের নানা বিষয়ে চিন্তা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

চিঠিতে তিনি ইরানকে আমেরিকার জন্য ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করেন।

ইরানি প্রেসিডেন্ট মার্কিন নাগরিকদের কাছে জবাব চেয়েছেন, রিপাবলিকান প্রসাশন কার স্বার্থে তেহরানের বিরুদ্ধে ‘শেষ মার্কিন সৈন্য বেঁচে থাকা পর্যন্ত’ লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছে।

ইসরায়েলকে ইঙ্গিত করে তিনি লিখেছেন, ইরানকে একটি ‘হুমকি’ হিসেবে চিত্রায়িত করার পেছনে বহিরাগত স্বার্থ কাজ করছে।

চিঠিতে পেজেশকিয়ান সরাসরি মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য এবং আমেরিকান জনগণের জন্য এর উপকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি জানতে চেয়েছেন, ‘এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকান জনগণের ঠিক কোন স্বার্থটি প্রকৃতপক্ষে পূরণ হচ্ছে?’

নির্দোষ শিশুদের গণহত্যা, ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ কারখানা ধ্বংস করা, অথবা একটি দেশকে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ দম্ভ করা—এসব কি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য পূরণ করে?’

চিঠিতে তিনি তার দেশের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর সাম্প্রতিক হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা করেছেন।

পেজেশকিয়ান লিখেছেন, ‘আধুনিক ইতিহাসে ইরান কখনোই আগ্রাসন, সম্প্রসারণ, উপনিবেশবাদ বা আধিপত্য বিস্তারের পথ বেছে নেয়নি। ইরান কখনোই আগে কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি। তবে যারা ইরানকে আক্রমণ করেছে, তাদের অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সঙ্গে জবাব দিয়েছে।’

তার মতে, ইরানকে আগ্রাসী হিসেবে তুলে ধরা ‘ঐতিহাসিক বাস্তবতার’ সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

আমেরিকানদের প্রতি ইরানি জনগণের কোনো বিদ্বেষ নেই বলে মন্তব্য করে চিঠিতে ইরানি প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, ‘আমেরিকা, ইউরোপ বা প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণসহ অন্যান্য জাতির প্রতি ইরানি জনগণের কোনো শত্রুতা নেই।’

ইরানকে ঘিরে থাকা আরব দেশগুলোতে বিপুল মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকেই মধ্যপ্রাচ্যে আসল হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি তেহরানের সামরিক অবস্থানকে সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক বলে আখ্যা দেন।

চিঠিতে পেজেশকিয়ান দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো থেকেই চালানো সাম্প্রতিক মার্কিন আগ্রাসনগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে এই ধরনের সামরিক উপস্থিতি আসলেই কতটা হুমকিস্বরূপ।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই, এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কোনো দেশই তার আত্মরক্ষামূলক সক্ষমতা জোরদার করা থেকে বিরত থাকবে না।’

তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘ইরান যা করেছে এবং করে চলেছে—তা বৈধ আত্মরক্ষা, এবং কোনোভাবেই যুদ্ধ বা আগ্রাসনের সূচনা নয়।’

১৯৫৩ সালে ইঙ্গো-মার্কিন জোটের সমর্থনে শাহ পালহবির পক্ষের অভ্যুত্থানকে চিঠিতে বর্তমান শত্রুতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। তিনি একে ‘একটি অবৈধ মার্কিন হস্তক্ষেপ’ বলে তীব্র নিন্দাও করেছেন।

তেহরান-ওয়াশিংটন বৈরিতার জন্য পরবর্তীকালে শাহের প্রতি মার্কিন সমর্থন, ১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন, নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক উস্কানিবিহীন সামরিক আগ্রাসনকে উল্লেখ করেছেন পেজেশকিয়ান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় বিনা উস্কানিতে মার্কিন বাহিনী তেহরানে হামলা শুরু করে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। এ পর্যন্ত দুই হাজারের মতো ইরানি নিহত হয়েছেন।

পাশাপাশি লেবাননেও আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরায়েল। সেখানে হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১০ লাখের মতো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এখন দক্ষিণ লেবানন দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে তেল আবিব।


সূত্র: আলজাজিরা


    শেয়ার করুন: