ইতিহাসের সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা
উগ্রবাদের ছায়া ব্রিটেনের শিশু-কিশোরদের মনে
- চরম ডানপন্থী উগ্রবাদ নিয়ে রেফারেল বেড়েছে ৪২ শতাংশ
- সবচেয়ে বড় বয়সগোষ্ঠী ১১-১৫ বছর
- অর্ধেকের বেশি ঘটনায় নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শই শনাক্ত হয়নি

শিশু-কিশোরদের মাঝে উগ্রবাদি ও চরম ডানপন্থি আচরণে উদ্বিগ্ন ব্রিটেনের শিক্ষক, পুলিশ ও চিকিৎসক। ছবি: রয়টার্স
বয়স মাত্র ১১, ১২ কিংবা ১৫। স্কুলে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়, বেশির ভাগ সময় হয়তো অনলাইনেই। কিন্তু তাদের কারও আচরণ, বক্তব্য অথবা সহিংসতার প্রতি আকর্ষণ দেখে শিক্ষক, পুলিশ কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীদের মনে হয়েছে–উগ্রবাদের দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
এমন উদ্বেগে ব্রিটেনের উগ্রবাদ প্রতিরোধ কর্মসূচি ‘প্রিভেন্ট’-এ পাঠানো মানুষের সংখ্যা এবার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৬ আগস্ট প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাবে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ১০ হাজার ২৯৩টি রেফারেল হয়েছে। এতে ছিলেন ৯ হাজার ৯৫৭ জন পৃথক ব্যক্তি। আগের বছরের ৭ হাজার ৪০৮টির তুলনায় রেফারেল বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। ২০১৫ সালে এই পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর এটিই এক বছরে সর্বোচ্চ।
নতুন পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক বয়স। যেসব রেফারেলে বয়স জানা গেছে, তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৬৫৫ জন, অর্থাৎ ৩৬ শতাংশের বয়স ১১ থেকে ১৫ বছর। এটি যেকোনো বয়সগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী ১ হাজার ৩৭৯ জন, যা মোটের ১৩ শতাংশ।
আর ‘চ্যানেল’ নামে আরও নিবিড় পর্যায়ের সহায়তার জন্য যেসব মামলা বিবেচিত হয়েছে, সেখানেও ১১-১৫ বছর বয়সীদের অংশ ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু প্রাথমিক সতর্কবার্তার মধ্যে থেমে নেই; ঝুঁকি বেশি বলে বিবেচিত মামলাতেও কিশোরদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
‘প্রিভেন্ট’ নিজে কোনো ফৌজদারি তদন্তব্যবস্থা নয়। ব্রিটিশ সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল ‘কনটেস্ট’-এর এই অংশটির লক্ষ্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই কাউকে উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়া থেকে সরিয়ে আনা। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, স্থানীয় সরকার, পুলিশ ও কারাগারের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের এমন ঝুঁকি দেখলে তা জানানোর আইনি দায়িত্ব রয়েছে।
উগ্রবাদের ধরনেও বড় পরিবর্তন। চরম ডানপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগ থেকে এক বছরে ২ হাজার ১০৩টি রেফারেল হয়েছে, যা মোটের ২০ শতাংশ। আগের বছরে সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৮০। অর্থাৎ এক বছরে বৃদ্ধি ৪২ শতাংশ।
এই শ্রেণির মধ্যে যাদের ‘চ্যানেল’ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। মতাদর্শের ধরন জানা ১ হাজার ৮০৭টি চ্যানেল মামলার মধ্যে ৭৫৬টি, অর্থাৎ ৪২ শতাংশই চরম ডানপন্থী উগ্রবাদসংক্রান্ত।
বয়সের হিসাবও এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। চরম ডানপন্থা নিয়ে করা রেফারেলগুলোর ৩৫ শতাংশই ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, চরম ডানপন্থী সন্ত্রাসের বর্তমান হুমকির প্রবণতার সঙ্গে এই বৃদ্ধির যোগ থাকতে পারে। দেশটির বর্তমান জাতীয় সন্ত্রাস-হুমকির মাত্রা ‘বিপজ্জনক’, অর্থাৎ একটি সন্ত্রাসী হামলা ঘটার আশঙ্কাকে ‘অত্যন্ত সম্ভাব্য’ বলে ধরা হচ্ছে।
অন্য দিকে ইসলামপন্থী উগ্রবাদ নিয়ে রেফারেলের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। সর্বশেষ এক বছরে এই শ্রেণিতে ৮৬০টি রেফারেল হয়েছে, যা মোটের ৮ শতাংশ। আগের বছরে ছিল ৯৪৫। অর্থাৎ হ্রাস প্রায় ৯ শতাংশ। তবে ব্রিটিশ সরকার বলছে, মোট রেফারেলের অনুপাতে সংখ্যা কমলেও চ্যানেল পর্যায়ে ইসলামপন্থী উগ্রবাদসংক্রান্ত মামলা সংখ্যায় বেড়েছে এবং ইসলামপন্থী সন্ত্রাস এখনও যুক্তরাজ্যের প্রধান সন্ত্রাসী হুমকি।
চ্যানেলে গৃহীত মতাদর্শ-নির্দিষ্ট মামলার মধ্যে ইসলামপন্থী উগ্রবাদের অংশ ১২ শতাংশ–২১২টি মামলা।
কিন্তু পরিসংখ্যানের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ অন্য জায়গায়৷ রেফারেলের ৫৬ শতাংশের ক্ষেত্রেই কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ শনাক্ত করা যায়নি। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫৮৩টি ঘটনায় কোনো মতাদর্শই চিহ্নিত হয়নি এবং আরও ২ হাজার ১৮৭টিতে মতাদর্শ না থাকলেও উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার অন্য ধরনের দুর্বলতা বা প্রবণতা দেখা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা, উগ্রবাদের বর্তমান জগৎ আগের তুলনায় অনেক বেশি খণ্ডিত। অনলাইনে কোনো একটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শ অনুসরণ না করেও কেউ চরম সহিংসতা, গণহত্যা কিংবা হামলার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন।
এই বাস্তবতা কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি করছে–উগ্রতার ঝুঁকি আছে, কিন্তু তার পেছনে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই।
এমনই একটি পৃথক শ্রেণি হলো, কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ ছাড়াই চরম সহিংসতা বা বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটানো হামলার প্রতি আকর্ষণ।
এই শ্রেণিতে রেফারেল হয়েছে ৮১৮টি, মোটের ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুনে এ ধরনের রেফারেল ২৫৩ শতাংশ বেড়ে ২৮৬-তে পৌঁছেছিল। পরে জুলাই-সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা কমে।
এই ক্ষেত্রেও শিশুদের উপস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগের। এই ৮১৮ রেফারেলের প্রায় অর্ধেক, ৪৯ শতাংশ ছিল ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের।
আর ‘ইনসেল’ বা নারীবিদ্বেষকেন্দ্রিক উগ্রবাদ নিয়ে রেফারেল হয়েছে ৯৫টি। বামপন্থী উগ্রবাদ নিয়ে রেফারেল মাত্র ৩২টি এবং একাধিক মতাদর্শের মিশ্র প্রভাব নিয়ে ৩৫৩টি।
কোথা থেকে এত রেফারেল আসছে, সেই হিসাবও বেশ স্পষ্ট৷ সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৪৯৬টি বা ৩৪ শতাংশ রেফারেল এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। দ্বিতীয় স্থানে পুলিশ, ৩ হাজার ২০৮টি বা ৩১ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাত থেকে রেফারেল এক বছরে ৫৮ শতাংশ, স্থানীয় সরকার থেকে ৫৭ শতাংশ এবং পুলিশ থেকে ৪৯ শতাংশ বেড়েছে।
এই তথ্যের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের বিপুল সংখ্যার সরাসরি যোগ রয়েছে। শিক্ষক ও স্কুলকর্মীরা অনলাইন আচরণ, সহিংস বক্তব্য কিংবা উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখলে প্রিভেন্ট-এ জানানোর দায়িত্বে রয়েছেন।
তবে রেফারেল হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উগ্রবাদী কিংবা সম্ভাব্য সন্ত্রাসী, এমন নয়। প্রাথমিক যাচাইয়ে অনেক রেফারেলই বাদ পড়ে।
মোট ১০ হাজার ২৯৩টি রেফারেলের মধ্যে ২ হাজার ১৫৯ জনকে, অর্থাৎ ২১ শতাংশকে ‘চ্যানেল’ প্যানেলে আলোচনা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৮১০ জনকে চ্যানেল মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
চ্যানেল হলো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্য সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত বহু-পক্ষীয় ব্যবস্থা। ঝুঁকি যাচাইয়ের পর প্রয়োজন হলে শিক্ষা, চাকরি, মানসিক স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা এবং মতাদর্শগত পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছামূলক।
সর্বশেষ পরিসংখ্যানে আরেকটি সংবেদনশীল তথ্য সামনে এসেছে। প্রিভেন্ট-এ পাঠানো ৯ হাজার ৯৫৭ ব্যক্তির মধ্যে ৩ হাজার ৬৩৩ জনের, অর্থাৎ প্রায় ৩৬ শতাংশের ক্ষেত্রে অন্তত একটি মানসিক স্বাস্থ্য বা স্নায়ুবৈচিত্র্যসংক্রান্ত অবস্থা নথিভুক্ত ছিল। সবচেয়ে বেশি ছিল অটিজম–১ হাজার ৮৩৩ জন বা ১৮ শতাংশ।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেই এই তথ্য সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহারের কথা বলেছে। নতুন তথ্যসংগ্রহব্যবস্থায় কিছু অবস্থা চিকিৎসকের নিশ্চিত রোগনির্ণয়ের ভিত্তিতে, আবার কিছু কেবল ‘সন্দেহ’ হিসেবে নথিভুক্ত। কর্মকর্তারাও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ নন। ফলে এই পরিসংখ্যান দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য বা অটিজমের সঙ্গে উগ্রবাদের সরাসরি সম্পর্ক টানা ঠিক হবে না।
অধিকার সংগঠন রাইটস এন্ড সিকিউরিটি ইন্টারন্যাশনাল এই সংখ্যাকে উদ্বেগজনক বলে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের আশঙ্কা, অটিজমে থাকা শিশু-কিশোরদের আচরণ ভুলভাবে নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে দেখা হতে পারে।
রেফারেলের এই বড় বৃদ্ধি এসেছে ২০২৪ সালের সাউথপোর্ট হামলার পর। সেই ঘটনায় একটি নাচের ক্লাসে তিন শিশুকে হত্যা এবং আরও কয়েকজনকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন অ্যাক্সেল রুদাকুবানা। হামলার আগে তাকে তিনবার প্রিভেন্ট-এ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু স্পষ্ট কোনো মতাদর্শগত যোগ পাওয়া না যাওয়ায় তার মামলা আর এগোয়নি। পরবর্তী তদন্তে ঘটনাটি ব্রিটেনের সন্ত্রাস প্রতিরোধব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে আসে।
এর পর থেকেই ‘স্পষ্ট মতাদর্শ নেই কিন্তু সহিংসতার প্রতি গভীর আকর্ষণ রয়েছে’ এমন ব্যক্তিদের কীভাবে শনাক্ত করা হবে, তা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সরকারের বক্তব্য: চ্যালেঞ্জও বড়, প্রিভেন্টের প্রয়োজনও
ব্রিটিশ নিরাপত্তামন্ত্রী ড্যান জারভিস বলেছেন, রেকর্ডসংখ্যক রেফারেল জনসাধারণকে সন্ত্রাস থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ কতটা বড় হয়ে উঠেছে, সেটিই দেখায়।
সরকারের হিসাবে, ২০১৫ সালের পর থেকে প্রিভেন্টের মাধ্যমে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে সহিংস মতাদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে আনার জন্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে রেফারেল, চ্যানেল আলোচনা ও গৃহীত মামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থার উপর চাপও বাড়ছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে।
ব্রিটেনে উগ্রবাদের ছবিটিও তাই বদলে যাচ্ছে। একসময় উদ্বেগের কেন্দ্র ছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় মতাদর্শ। এখন সেখানে যোগ হয়েছে চরম ডানপন্থা, নারীবিদ্বেষী ‘ইনসেল’ মতবাদ, অনলাইনে গণহত্যা ও চরম সহিংসতার প্রতি আকর্ষণ, এমনকি কোনো স্পষ্ট মতাদর্শ ছাড়াই সহিংস হয়ে ওঠার ঝুঁকি।
আর সরকারি পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বড় বয়সগোষ্ঠী যখন ১১ থেকে ১৫ বছর, তখন প্রশ্নটি শুধু সন্ত্রাস দমনের নয়।
ব্রিটেনের নতুন লড়াই এখন "উগ্রবাদ শিশুদের কাছে পৌঁছনোর আগেই তাকে থামানো যাবে কি না।"




