জনতার পছন্দ বার্নহ্যাম, বাজারের নয়
- ১৮ বছরে সর্বোচ্চ ঋণের খরচ
- প্রথম বাজেটের আগেই কঠিন পরীক্ষায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

অর্থনীতির চাপের মাঝেও প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখনও প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক বেশি।
বাজারে হঠাৎ উঠেছে ঝড়। ব্রিটিশ সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ ১৮ বছরে সর্বোচ্চ, পাউন্ড দুর্বল, সামনে প্রথম বাজেট। অথচ এই চাপের মাঝেও প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখনও প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ব্রিটেনে এখন প্রশ্ন একটাই, অর্থনীতির এই ঢেউ কি তার সদ্য শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রিত্বের রাজনৈতিক ‘হানিমুন’ ভাসিয়ে নিয়ে যাবে?
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে কলামিস্ট অ্যালিস্টার হিথ এই পরিস্থিতিকে ‘আর্থিক সুনামি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, বাজারে আস্থা আরও নষ্ট হলে অর্থমন্ত্রী জন হিলির ২৮ অক্টোবরের প্রথম বাজেটেই কর বাড়ানো ও ব্যয় কাটার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
বাজারের বাস্তব চিত্র অবশ্য উদ্বেগজনক। বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রিটেনের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ড বা গিল্টের ফলন ৫ দশমিক ২৬৮ শতাংশে ওঠে, যা ২০০৮ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ। ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ফলনও প্রায় ৫ দশমিক ৯ শতাংশে গিয়ে ১৯৯৮ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি থাকে। ইরান যুদ্ধ ঘিরে তেলের দাম বাড়া, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং সরকারি ঋণের চাপ সব মিলিয়েই বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদ চাইছেন।
প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিকসের হিসাবে, বাড়তি সুদ ব্যয়ের কারণে সরকারের আর্থিক ‘হেডরুম’ বসন্তের ২৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন পাউন্ড থেকে কমে প্রায় ১৩ বিলিয়ন পাউন্ডে নেমে এসেছে। আগের নিরাপত্তা মার্জিন ফিরিয়ে আনতেই বছরে প্রায় ১১ বিলিয়ন পাউন্ড কর বাড়ানো অথবা ব্যয় কমাতে হতে পারে। একই দিনে পাউন্ড ডলারের বিপরীতে তিন সপ্তাহের সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৩৪৯০ ডলারে নেমে যায়।
এই চাপের মুখে বার্নহ্যাম ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বলেছেন, সরকার আর্থিক নিয়ম মেনে চলবে। কর বাড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি আগাম বাজেট লিখতে অস্বীকার করেন। বিরোধী কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনকের প্রশ্নের জবাবে বাজারের অস্থিরতার প্রসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের সময়কার বিপর্যয়ের কথাও তোলেন তিনি।
কিন্তু রাজনৈতিক ছবিটা এখনও ভিন্ন। ২৬ থেকে ২৮ আগস্ট ২,০৫০ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করা অপিনিয়াম জরিপে বার্নহ্যামের নেট অনুমোদন ছিল প্লাস ১৪। লেবার পার্টি ২৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে রিফর্ম ইউকের ২৫ শতাংশের সামান্য এগিয়ে। ‘সেরা প্রধানমন্ত্রী’ প্রশ্নে ব্যাডেনকের বিপরীতে বার্নহ্যামকে বেছে নিয়েছেন ৩৭ শতাংশ, ব্যাডেনককে ১৯ শতাংশ; নাইজেল ফারাজের বিপরীতে ব্যবধান ৪৩ বনাম ২৪।
সরকারি ওয়েবসাইট ইউগভের ১৮ আগস্টের জরিপেও ৪৬ শতাংশ ব্রিটিশ বার্নহ্যামকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন; নেট জনপ্রিয়তা প্লাস ১৩, যা ছয় বছরের বেশি সময়ে কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ। তবে দ্য টাইমসের জনপ্রিয়তা ট্র্যাকার একটি সতর্ক সংকেতও দেখিয়েছে: মাত্র ২৩ শতাংশ মনে করেন তিনি সামগ্রিকভাবে দেশের স্বার্থে শাসন করবেন, আর মাত্র ২২ শতাংশ বিশ্বাস করেন তার আমলে তাদের জীবন উন্নত হবে।
দ্য টাইমসের ট্র্যাকার বলেছে, ডাউনিং স্ট্রিটে আসার পর ২ পাউন্ডের বাসভাড়া সীমা, জ্বালানি বিলে ভ্যাট তুলে দেওয়া এবং ‘নাম্বার ১০ নর্থ’ নামে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মতো পদক্ষেপ তার ভাবমূর্তিতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে জরিপে তিনি স্টারমার, ফারাজ ও গ্রিন নেতা জ্যাক পোলানস্কির চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তবে বাজারের সংকট দীর্ঘ হলে এই রাজনৈতিক সুবিধা কত দ্রুত ক্ষয়ে যাবে, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।
অর্থাৎ বার্নহ্যামের সামনে আপাতত দুই ব্রিটেন। একটিতে এখনও তার প্রতি ব্যক্তিগত আস্থা আছে; অন্যটিতে ঋণের সুদ, জ্বালানির দাম আর বাজেটের অঙ্ক ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। জনপ্রিয়তা তাকে সময় দিতে পারে, কিন্তু বন্ডবাজার সময় দেয় না। সেই বাজারই এখন ঠিক করবে বার্নহ্যামের ‘আশার রাজনীতি’ প্রথম বাজেটেই বাস্তবতার দেয়ালে ধাক্কা খাবে, নাকি ঝড় সামলে টিকে যাবে।





