সেনাশিবিরের বন্ধ দরজার আড়ালে কী ঘটে?
কিশোরী সেনাদের ধর্ষণের অভিযোগে ব্রিটেনজুড়ে সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তদন্ত শুরু
- যেখানে সৈনিক হওয়ার স্বপ্ন, সেখানেই নির্যাতনের ‘অত্যন্ত জঘন্য’ অভিযোগ
- হ্যারোগেট-কাণ্ডে খুলছে আরও ৯ দরজা
- ধর্ষণের অভিযোগের পর সেনাশিবিরে আসছেন স্বাধীন কমিশনার

সৈনিক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যে কিশোরীরা ব্যারাকের দরজা পেরিয়েছিল, তাদের কয়েকজনের অভিযোগ, সেই দরজার আড়ালেই অপেক্ষা করছিল যৌন হয়রানি, নিপীড়ন, এমনকি ধর্ষণ। উত্তর ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেটে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কলেজ নিয়ে সেই ভয়াবহ অভিযোগ এবার ব্রিটেনের সামরিক প্রশিক্ষণব্যবস্থার আরও বিস্তৃত অন্দরমহলকে তদন্তের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডের ১০টি সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে স্বাধীন তদন্ত শুরু করছেন ব্রিটেনের সশস্ত্র বাহিনী কমিশনার পলি মিলার-পারকিন্স। হ্যারোগেটের আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজে অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী প্রশিক্ষণার্থীদের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি কমিশনার হিসেবে মিলার-পারকিন্সের প্রথম বড় তদন্ত।
গত আগস্টে চার তরুণী বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, হ্যারোগেটের ওই কলেজে প্রশিক্ষণের সময় তাদের যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি করা হয়েছিল। ঘটনার সময় তাদের প্রত্যেকের বয়স ছিল ১৭ বছর। তাদের একজনের অভিযোগ, কয়েকজন সমবয়সী প্রশিক্ষণার্থী তাকে কয়েক ঘণ্টা ধরে ধর্ষণ করেছিলেন। বিবিসির আগের অনুসন্ধানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত কলেজটিতে অনুপযুক্ত যৌন আচরণের ১৭৬টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩২টি স্থায়ী কর্মীদের বিরুদ্ধে এবং ১৪৪টি প্রশিক্ষণরত তরুণ সৈনিকদের বিরুদ্ধে।
মিলার-পারকিন্স এসব অভিযোগকে বলেছেন, “একেবারেই জঘন্য”। তার ভাষায়, বিবিসির অনুসন্ধান সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে নারীদের লক্ষ্য করে শিকারি আচরণসহ সম্ভাব্য সমস্যাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি বলেছেন, বিষয়টিকে তিনি “অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে” নিচ্ছেন।
তদন্তের আওতায় হ্যারোগেট ছাড়াও থাকবে রাজকীয় সামরিক একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট, ডার্টমাউথের ব্রিটানিয়া রাজকীয় নৌ কলেজ, হ্যালটন ও ক্র্যানওয়েলের বিমানবাহিনী প্রশিক্ষণকেন্দ্র, র্যালি নৌ প্রশিক্ষণকেন্দ্র, লিম্পস্টোনের কম্যান্ডো প্রশিক্ষণকেন্দ্র, পিরব্রাইট প্রশিক্ষণকেন্দ্র, উইনচেস্টার প্রশিক্ষণ রেজিমেন্ট এবং ক্যাটেরিক পদাতিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র। কমিশনার আগামী নভেম্বরে কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে প্রশিক্ষণার্থী, কর্মী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলবেন। নতুন বছরের শুরুতে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনী কমিশনারের দপ্তর জানিয়েছে, এই পর্যালোচনায় প্রথম পর্যায়ের সামরিক প্রশিক্ষণে কল্যাণ, আচরণ ও প্রশিক্ষণার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখা হবে। নতুন এই স্বাধীন কমিশনারের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অঘোষিতভাবে প্রবেশ এবং সরকারের কাছে তথ্য চাওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। তার সুপারিশ প্রকাশ্যে আনা হবে।
তবে হ্যারোগেটের এক সাবেক প্রশিক্ষণার্থী বিবিসিকে বলেছেন, সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘদিন কাজ করা আরেক ব্যক্তির কাছে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা অকপটে বলবেন কি না, সে বিষয়ে অনেকেরই সংশয় থাকতে পারে। জবাবে মিলার-পারকিন্স স্বীকার করেছেন, “বিশ্বাস অর্জন করতে হয়।” তার বক্তব্য, প্রমাণ যে দিকে নিয়ে যাবে, তদন্তও সেই পথেই যাবে।
এই অভিযোগের মধ্যেই রয়েছে এক অস্বস্তিকর বৈপরীত্য। গত মার্চে সরকারি পরিদর্শকেরা হ্যারোগেট কলেজের প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও কল্যাণব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ মানের বলে মূল্যায়ন করেছিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও বলেছে, সামরিক বাহিনীতে অপরাধমূলক বা অগ্রহণযোগ্য আচরণের কোনো স্থান নেই এবং স্বাধীন নজরদারিকে তারা স্বাগত জানায়।
এখন তাই তদন্তের সামনে প্রশ্ন শুধু কয়েকটি ব্যারাকের নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর। যে ব্যবস্থার কাজ তরুণদের শৃঙ্খলা, দায়িত্ব ও সম্মান শেখানো, তার ভেতরেই যদি কেউ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, তবে চকচকে কুচকাওয়াজের আড়ালে কী থেকে যায় অদেখা? আগামী মাসগুলোতে সেই বন্ধ দরজার ওপাশেই উত্তর খুঁজবেন তদন্তকারীরা।



