ব্রিটেন ভাঙার নতুন সুর
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিতে এক মঞ্চে নেতারা

ওয়েলসের প্লেইড কামরি নেতা রুন আপ আইওরওয়ার্থ, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সিন ফেইন নেত্রী মিশেল ও’নিল এবং স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা জন সুইনি
ব্রিটেনের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন করে উঠছে স্বাধীনতার প্রশ্ন। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতারা এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দাবি করতে চলেছেন। কার্ডিফে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘সেল্টিক সামিট’-এ তিন দেশের নেতারা একটি সমঝোতাপত্রে সই করবেন, যেখানে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে সাংবিধানিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করার আহ্বান জানানো হবে।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়েলসের প্লেইড কামরি নেতা রুন আপ আইওরওয়ার্থ, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা জন সুইনি এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সিন ফেইন নেত্রী মিশেল ও’নিল এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে থাকবেন সিন ফেইনের প্রেসিডেন্ট মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও।
সম্মেলনের মূল বার্তা: স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার থাকা উচিত। প্রস্তাবিত সমঝোতাপত্রে ওয়েস্টমিনস্টার সরকারকে “ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও সহযোগিতা করার” আহ্বান জানানো হবে।
এই সম্মেলনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে। মে মাসের সেনেড (ওয়েলস পার্লামেন্ট) নির্বাচনে প্লেইড কামরির সাফল্যের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যের তিনটি সেল্টিক অঞ্চলের সরকারই স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বে রয়েছে। ফলে স্বাধীনতার দাবিকে নতুন রাজনৈতিক গতি দিয়েছে এই সমীকরণ।
স্কটিশ নেতা জন সুইনি বলেছেন, “আমরা সাংবিধানিক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি।” তাঁর মতে, “ওয়েস্টমিনস্টার কখনও আমাদের স্বার্থ রক্ষা করবে না”, এই বিশ্বাস থেকেই জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের অবস্থানও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট হতে পারে যদি সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন তৈরি হয়। তাঁর এই মন্তব্যকে স্বাধীনতাপন্থীরা ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখলেও, প্রধানমন্ত্রীর দফতর জানিয়েছে, সরকারের নীতিতে কোনও পরিবর্তন হয়নি।
বার্নহ্যামের সরকার অবশ্য স্কটল্যান্ডের নতুন গণভোটকে সমর্থন করে না। ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য, দেশবাসীর মূল উদ্বেগ এখন অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, জনসেবা ও নিরাপত্তা; স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়।
এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক আলোচনাতেও বিষয়টি উঠে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়ে বলেছেন, তিনি “একীভূত আয়ারল্যান্ড” দেখতে পছন্দ করবেন। তাঁর মন্তব্য নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ব্রিটেনপন্থী রাজনৈতিক মহলে অসন্তোষ তৈরি করেছে। ট্রাম্প অবশ্য স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করে বলেন, “ওই বিষয়টি নিয়ে আমি অন্য কোনও দিন কথা বলব।”
বর্তমান জনমতও স্বাধীনতার প্রশ্নকে ফের আলোচনায় এনেছে। সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, স্কটল্যান্ডে প্রায় ৪৭ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে মত দিতে পারেন। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে এই সমর্থন প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং ওয়েলসে ৩২ শতাংশের কাছাকাছি।
তবে ব্রিটেনের সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীনতার পথ সহজ নয়। ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা গণভোটে ৫৫ শতাংশ ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। নতুন করে গণভোট আয়োজনের জন্য ওয়েস্টমিনস্টারের সম্মতি প্রয়োজন।
তবু কার্ডিফের এই সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে, ব্রিটেনের ভেতরে ক্ষমতা বণ্টন, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে বিতর্ক এখন আর শুধু প্রান্তিক দাবি নয়। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতারা দেখাতে চাইছেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁদের লড়াই আলাদা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সেল্টিক রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ।



