যুদ্ধ আর বিভক্তির বছরে কার হাতে উঠবে নোবেল শান্তি পুরস্কার?

বিশ্ব যখন একের পর এক যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন শুক্রবার অসলো থেকে ঘোষণা করা হবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার। ইউক্রেন যুদ্ধ, সুদানের মানবিক সংকট, গাজায় সংঘাত, আন্তর্জাতিক আইনের চ্যালেঞ্জ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অস্ত্রের ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এবার পুরস্কারটি কেবল একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি নয়, বরং বিশ্বকে দেওয়া একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর শান্তি পুরস্কারের জন্য ২৮৭টি মনোনয়ন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে নোবেল কমিটি মনোনীতদের নাম প্রকাশ করে না। মনোনয়ন ও মূল্যায়নসংক্রান্ত নথি ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখা হয়। ফলে এখন যে নামগুলো আলোচনায় রয়েছে, সেগুলো মূলত গবেষক, বিশ্লেষক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের ভিত্তিতে উঠে এসেছে।
এ বছর সম্ভাব্য বিজয়ীদের নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত তালিকাগুলোর একটি প্রকাশ করেছে নরওয়ের পিস এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হোকান ইয়োরলোভ প্রতি বছরের মতো এবারও নিজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সম্ভাব্য কয়েকটি নাম প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ; এর সঙ্গে নোবেল কমিটি বা নোবেল ইনস্টিটিউটের কোনো সম্পর্ক নেই।
হোকান ইয়োরলোভ এর তালিকার প্রথমেই রয়েছে ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মিকোলা কুলেবা এবং আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেন। মিকোলা কুলেবা ২০১৪ সালে সেভ ইউক্রেন প্রতিষ্ঠা করেন এবং এরপর থেকে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের উদ্ধার এবং পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার কাজে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। অন্যদিকে সেভ দ্য চিলড্রেন বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শিশুদের সুরক্ষা, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। পিস এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, তাদের পুরস্কৃত করা হলে যুদ্ধের সবচেয়ে অবহেলিত শিকার শিশুদের দুর্দশা নতুন করে বিশ্ববাসীর নজরে আসবে।
তালিকায় রয়েছে সুদানের ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমসের নামও। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর যখন আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে থাকে, তখন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের এই নেটওয়ার্ক কমিউনিটি কিচেন, চিকিৎসাসেবা, উদ্ধারকাজ এবং জরুরি সহায়তার দায়িত্ব নিজেরাই কাঁধে তুলে নেয়। পিস এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট মনে করে, এই সংগঠনকে পুরস্কৃত করা হলে সংকটকালে স্থানীয় মানবিক উদ্যোগের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
আরেকটি আলোচিত নাম কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা এই আন্তর্জাতিক সংগঠনটি বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নিখোঁজ হওয়া ও হত্যাকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের পক্ষে প্রচারণা চালায়। পিস এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, সাংবাদিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের প্রেক্ষাপটে সিপিজেকে পুরস্কৃত করা হলে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও গণতন্ত্র রক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হবে।
হোকান ইয়োরলোভ এর তালিকায় আরও রয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। তার মতে, ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের এই সময়ে আন্তর্জাতিক আইন, জবাবদিহিতা এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। আইসিজে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করে, আর আইসিসি গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হলে আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি সমর্থনের বার্তা যাবে।
তাঁর তালিকার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী নাম আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন। এক শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীরা সেখানে একসঙ্গে কাজ করছেন। পৃথিবীতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও মহাকাশে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। পিস এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, আইএসএসকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিকতার গুরুত্বের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে।
অন্যদিকে সুইডেনের উতরিকেসপোলিটিসকা ইনস্টিটিউটের সাময়িকী উতরিকেসমাগাসিনেৎ-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে শান্তি ও সংঘাত গবেষক ইসাক সেভেনসন সম্ভাব্য বিজয়ীর নামের চেয়ে নোবেল কমিটি কী ধরনের বার্তা দিতে পারে, তার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, বিশ্বে রেকর্ডসংখ্যক সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নোবেল কমিটি এমন কাউকে বেছে নিতে পারে, যিনি বা যারা অহিংস আন্দোলন, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন।
এই বিশ্লেষণে তুরস্কের কারাবন্দি কুর্দি রাজনীতিক সেলাহাত্তিন দেমিরতাশ-এর নাম এসেছে। তিনি কুর্দিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে অহিংস ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পথের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। ইসাক সভেনসন-এর মতে, তাঁকে পুরস্কৃত করা হলে তা তুরস্ক ও সিরিয়ায় কুর্দিদের প্রশ্নে রাজনৈতিক সমাধান এবং সংলাপের প্রতি সমর্থনের বার্তা হবে।
একই বিশ্লেষণে ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মী ইসা আমরো-এর কথাও এসেছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনের জন্য তিনি পরিচিত। পাশাপাশি রয়েছে ইসরায়েলের যৌথ ইহুদি-আরব আন্দোলন স্ট্যান্ডিং টুগেদার, যা শান্তি, মানবাধিকার ও সহাবস্থানের পক্ষে কাজ করে। ইসাক সেভেনসন এর মতে, এ ধরনের উদ্যোগকে পুরস্কৃত করা হলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মধ্যে সহিংসতার বিকল্প হিসেবে সংলাপ ও সহাবস্থানের বার্তা যাবে।
আলোচনায় রয়েছে স্টপ কিলার রোবটস-ও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিষিদ্ধের দাবিতে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক প্রচারণা নতুন প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের প্রতিফলন। ইসাক সেভেনসন মনে করেন, তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হলে যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়বে।
সুইডিশ প্রকাশনা কিৎ-এর আলোচনাতেও ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস, মিকোলা কুলেবা, সেভ দ্য চিলড্রেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এবং ইউলিয়া নাভালনায়া-এর নাম উঠে এসেছে। তবে প্রকাশনাটি উল্লেখ করেছে, এসব তালিকা জনআলোচনা, সংবাদপ্রবাহ এবং পূর্বাভাসভিত্তিক ওপর নির্ভর করে তৈরি; নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এগুলো কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাস বলছে, চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম প্রায়ই অনুমানের তালিকার বাইরে থেকেও এসেছে। তাই এবারও চমকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, যুদ্ধ, মানবিক সংকট, শিশুদের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক আইন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এ বছরের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে ৯ অক্টোবর অসলো থেকে যে নামই ঘোষণা করা হোক না কেন, সেটি শুধু একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্জনের স্বীকৃতি হবে না; বরং অশান্ত বিশ্বের সামনে নোবেল কমিটি কোন মূল্যবোধকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, তারও প্রতিফলন হবে।
তথ্যসূত্র: নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি, নোবেল পিস প্রাইজ, পিস এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো,উতরিকেসমাগাসিনেৎ, কিৎ



