সাধারণের সমর্থন কমার আশঙ্কা
রিফর্ম ইউকের তহবিলে রেকর্ড অর্থ
- দুই দিনে ৭২ মিলিয়ন পাউন্ড!

নাইজেল ফারাজের দলের হাতে এসেছে মোট ৭২ মিলিয়ন পাউন্ড, যা ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় অনুদান।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে অর্থের অঙ্ক যেন এক লাফে বদলে দিল খেলার নিয়ম। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে পেয়েছে দুটি রেকর্ড অনুদান৷ প্রতিটি ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ড। প্রথমে ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা বেন ডেলো, তার পর একই অঙ্কের অর্থ দিলেন ক্রিস্টোফার হারবোর্ন। ফলে নাইজেল ফারাজের দলের হাতে এসেছে মোট ৭২ মিলিয়ন পাউন্ড, যা ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় অনুদান। এই অর্থ ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের সব রাজনৈতিক দল মিলে পাওয়া মোট অনুদানের চেয়েও বেশি।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হারবোর্নের ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ডের অনুদান ডেলোর এক দিন আগের রেকর্ড অনুদানের সমান। দুই দাতাই ক্রিপ্টো খাতের সঙ্গে যুক্ত। ডেলো ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটমেক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা। অর্থপাচারবিরোধী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মামলায় যুক্তরাষ্ট্রে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমা পেয়েছিলেন তিনি।
ডেলো বলেছেন, এই অর্থ রিফর্ম ইউকেকে লেবার ও কনজারভেটিভদের সঙ্গে “সমান লড়াই” করার সুযোগ দেবে। তার মতে, ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন শক্তির জন্য বড় আকারের সংগঠন ও প্রচার প্রয়োজন, আর এই অর্থ সেই সুযোগ তৈরি করবে।
হারবোর্নও রিফর্ম ইউকের দীর্ঘদিনের বড় দাতা। তাঁর সর্বশেষ অনুদানের পর ফারাজের দল জানিয়েছে, আগামী সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে তারা দেশজুড়ে সংগঠন আরও শক্তিশালী করবে। প্রচারকর্মী নিয়োগ, স্থানীয় পর্যায়ে দলের উপস্থিতি বাড়ানো এবং নির্বাচনী প্রচার সম্প্রসারণে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
তবে এই বিপুল অর্থ রিফর্মের জন্য শুধু সুবিধা নয়, তৈরি করছে নতুন রাজনৈতিক ঝুঁকিও। দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নাইজেল ফারাজ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে “সাধারণ ব্রিটিশ মানুষের কণ্ঠ” হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু কয়েকজন অতি ধনী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিপুল অনুদান পাওয়ার পর বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছে, রিফর্ম কি সত্যিই সাধারণ মানুষের দল, নাকি ধনীদের অর্থে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প?
বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ নির্বাচনী প্রচারে রিফর্মকে বড় সুবিধা দিলেও সাধারণ ভোটারের একাংশের মধ্যে উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান ও অভিবাসন নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করা একটি দলের সঙ্গে বিলিয়নিয়ারদের বিশাল অর্থায়নের সম্পর্ক ভোটারদের কাছে অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
এই বিতর্কের মধ্যেই রিফর্মের অর্থায়ন নিয়ে তদন্তও চলছে। বিদেশি উৎস থেকে রাজনৈতিক অর্থায়নের নিয়ম পাশ কাটানোর চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। চ্যানেল ৪-এর গোপন অনুসন্ধানের পর দলের দুই জ্যেষ্ঠ সহকারী সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। রিফর্ম অবশ্য কোনও আইন ভাঙার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ফারাজ নিজেও হারবোর্নের কাছ থেকে পাওয়া কথিত ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের ব্যক্তিগত উপহার যথাযথভাবে ঘোষণা করেছিলেন কি না, তা নিয়ে সংসদীয় পর্যায়ে তদন্তের মুখে রয়েছেন। ফলে ৭২ মিলিয়ন পাউন্ড যেমন রিফর্মের নির্বাচনী শক্তি বাড়াচ্ছে, তেমনই দলের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন বাড়াচ্ছে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটসহ বিরোধী দলগুলো রাজনৈতিক অনুদানে সীমা আরোপের দাবি তুলেছে। তাদের প্রশ্ন, কয়েকজন ধনী ব্যক্তির বিপুল অর্থ কি ব্রিটিশ গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে? বিশেষ করে রিফর্ম ইউকের ক্রিপ্টো-বান্ধব অবস্থানের কারণে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, দুই দিনে ৭২ মিলিয়ন পাউন্ডের এই অনুদান শুধু রিফর্ম ইউকের তহবিল বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে ব্রিটিশ রাজনীতির আর্থিক সমীকরণও। আগামী নির্বাচনের আগে এই অর্থ দলটিকে কতটা এগিয়ে দেবে, আর সাধারণ ভোটাররা এটিকে কীভাবে দেখবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।



