ব্রিটেনের আকাশে নতুন আতঙ্ক, ঘরে ঘরে ঢুকছে ডেঙ্গুর বাহক মশা

যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো 'এডিস ইজিপ্টাই' প্রজাতির মশার বংশবিস্তার শনাক্ত হয়েছে।
এতদিন যে মশার ভয় ছিল দূর দেশের উষ্ণ আবহাওয়ার সঙ্গে, এবার সেই মশাই দেখা দিল ব্রিটেনের মাটিতে। লন্ডনের ঘরের ভেতরেই বংশবিস্তার করতে দেখা গেল এমন এক প্রজাতির মশা, যা ছড়াতে পারে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার মতো বিপজ্জনক রোগ। তবে আতঙ্কের মধ্যেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশ্বাস, এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি খুবই কম।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো 'এডিস ইজিপ্টাই' প্রজাতির মশার বংশবিস্তার শনাক্ত হয়েছে। লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি আবাসিক এলাকায় প্রাপ্তবয়স্ক মশা ও তাদের লার্ভা পাওয়া যায়। বিষয়টি নজরে আসার পর যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি (ইউকেএইচএসএ) নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করেছে।
এডিস ইজিপ্টাইকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোগবাহক মশা হিসেবে ধরা হয়। এই মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং ইয়েলো ফিভারের মতো ভাইরাস ছড়াতে পারে। সাধারণত উষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এই মশার বিস্তার বেশি দেখা যায়।
তবে ব্রিটিশ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। ইউকেএইচএসএ-এর মেডিক্যাল এনটোমোলজি ও জুনোসিস বিভাগের প্রধান ড. জোলিয়ন মেডলক বলেছেন, এই মশা এমন দেশে রোগ ছড়াতে পারে যেখানে এসব ভাইরাস সক্রিয়ভাবে রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাজ্যের বর্তমান জলবায়ু দীর্ঘমেয়াদে এদের স্থায়ীভাবে টিকে থাকার জন্য অনুকূল নয়। এখন পর্যন্ত এই মশার মাধ্যমে কোনও মানুষের সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ধারণা, মশাগুলো সম্ভবত বিদেশ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্রিটেনে এসেছে। গাড়ি, লাগেজ কিংবা আমদানি করা গাছপালার মাধ্যমে এমন মশা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছাতে পারে।
ব্রিটেনে এর আগেও এই প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল, তবে এবারই প্রথম স্থানীয় পরিবেশে এদের বংশবিস্তার প্রমাণ পাওয়া গেল। ইউকেএইচএসএ জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকায় মশার লার্ভা ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আরও মশা রয়েছে কি না তা খুঁজতে বাড়ানো হয়েছে ফাঁদ ও নজরদারি ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে আগে যেখানে টিকে থাকা কঠিন ছিল, এমন কিছু প্রাণী ও রোগবাহক এখন নতুন এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার পাঠকদের জন্যও এই ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে ডেঙ্গু দীর্ঘদিনের বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিয়মিত দক্ষিণ এশিয়া যাতায়াত করেন। ফলে নতুন ধরনের রোগবাহক সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তবে ব্রিটিশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাধারণ মানুষকে শুধু সতর্ক থাকতে হবে–বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা, বালতি, টব বা ছোট পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া এবং মশার উপস্থিতি দেখলে তা জানানো।
একসময় যে মশা ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের পরিচিত আতঙ্ক, সেই মশার ব্রিটিশ মাটিতে পা রাখা যেন বদলে যাওয়া পৃথিবীর আরেকটি সতর্কবার্তা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি এখনই মহামারির সংকেত নয়; কিন্তু উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবীতে ভবিষ্যতের ঝুঁকির একটি ছোট্ট ইঙ্গিত।





