ডিজিটাল ফেলে বইয়ের দুনিয়ায় ফিরছে সুইডেন
- স্ক্রিনবিহীন পাঠ শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখায় সহায়ক

বই পড়ায় ব্যস্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী। ছবি : সংগৃহীত
সাক্ষরতার নিম্নমুখী হার উল্টে দিতে শ্রেণিকক্ষে আবারও ছাপানো বই, কাগজ ও কলম ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে সুইডেন সরকার। এ ছাড়া তাদের যুক্তি, স্ক্রিনবিহীন পাঠ শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখা এবং লেখা ও পড়ার দক্ষতা উন্নত করতে তৈরি করে আরও ভালো পরিবেশ।
তবে অ্যানালগ উপকরণের ওপর দ্বিগুণ জোর দেওয়ার ঘটনার সমালোচনা করছে প্রযুক্তি কোম্পানি, শিক্ষাবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এটি শিক্ষার্থীদের চাকরির সম্ভাবনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি ক্ষতি করতে পারে নর্ডিক দেশটির অর্থনীতিরও।
এটি এমন একটি চিত্র, যা ইউরোপের অন্যতম প্রযুক্তি-সচেতন সমাজ হিসেবে সুইডেনের পরিচিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেখানে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ডিজিটাল দক্ষতা এবং একটি সমৃদ্ধ প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ পরিবেশ।
গত শতকের শেষভাগ এবং ২০১০ দশকের শুরুর দিকে সুইডেনের শ্রেণিকক্ষে সাধারণ হয়ে ওঠে ল্যাপটপের ব্যবহার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মধ্যে পৌরসভাচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীর সুযোগ ছিল ব্যক্তিগতভাবে একটি ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের।
২০১৯ সালে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ট্যাবলেটের বাধ্যতামূলক ব্যবহার, যা ছিল আগের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগের অংশ। এর লক্ষ্য ছিল যাতে সবচেয়ে ছোট বয়সের শিশুদেরও প্রস্তুত করা যায় ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য।
কিন্তু ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসে বর্তমান ডানপন্থি জোট শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে যাচ্ছে ভিন্ন দিকে। সুইডেনের শিক্ষামন্ত্রী জোয়ার ফর্সেলের ভাষ্য, ‘আমরা চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব স্ক্রিন কমিয়ে দেওয়ার। উচ্চ শ্রেণিতে হয়তো এগুলো একটু বেশি ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু কম বয়সে বা স্কুলে একেবারেই স্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত নয় আমাদের।’
সরকার প্রায়ই ‘ফ্রান স্কার্ম টিল পার্ম’ স্লোগানটি ব্যবহার করেছে, যা সুইডিশ ভাষায় বেশ আকর্ষণীয় শোনায় এবং এর অর্থ ‘স্ক্রিন থেকে ফাইল বা বাইন্ডারে।’ এর সারকথা হলো, স্ক্রিনবিহীন পাঠ শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখতে এবং তাদের লেখা ও পড়ার দক্ষতা উন্নত করতে তৈরি করে আরও ভালো পরিবেশ।
২০২৫ সাল থেকে আর ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার করতে বাধ্য নয় প্রি-স্কুলগুলো এবং দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের দেওয়া হয় না ট্যাবলেট। শিগগিরই স্কুলে মোবাইল ফোনের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে, এমনকি শিক্ষামূলক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও।
স্কুলগুলো এরই মধ্যে পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষকের গাইডে বিনিয়োগের জন্য অনুদান পেয়েছে ২ দশমিক ১ বিলিয়নেরও বেশি ক্রোনা (২০০ মিলিয়ন ডলার)। পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে একটি নতুন পাঠ্যক্রম চালু হওয়ার কথা ২০২৮ সালে।
শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তি যে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে, সে বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. সিসেলা নাটলি। তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা স্ক্রিনে অন্য শিশুরা কী করছে তা দেখে হারাতে পারে মনোযোগ । তিনি আরও উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক গবেষণার একটি ক্রমবর্ধমান অংশ ইঙ্গিত দেয়, ডিজিটাল ডিভাইসে লেখাপড়া শিশুদের জন্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণকে তুলতে পারে কঠিন করে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ছোট শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকার আশা করছে, আরও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষণ পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া সুইডেনের পিসা র্যাংকিংয়ে অবস্থান উন্নত করতে সাহায্য করবে, যা অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার মূল শিক্ষাবিষয়গুলোর জন্য একটি মানদণ্ড।
কিন্তু সুইডেনে সরকারের বইমুখী শিক্ষায় ফেরার কৌশল তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে ব্যবসায়িক মহলে। সুইডিশ এডটেক ইন্ডাস্ট্রি নামে বাণিজ্য সংগঠনের একটি নতুন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, আরও অ্যানালগ শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের অপ্রস্তুত করে দিতে পারে ভবিষ্যৎ চাকরির জন্য।
সংগঠনের সিইও এবং সাবেক শিক্ষক জানি ইয়েপেসেন মনে করেন, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য সবারই প্রয়োজন মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতা । তিনি ইইউর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে, শিগগিরই ৯০ শতাংশ চাকরির জন্য প্রয়োজন হবে ডিজিটাল দক্ষতা।
ইয়েপেসেন উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও উদ্ভাবনের ওপর প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন। তার মতে, যদি সুইডেনে প্রয়োজনীয় আইটি দক্ষতা না পাওয়া যায়, তাহলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো চলে যাবে ‘অন্যত্র’।
রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ব্যবহারের বিষয়টিও। সুইডিশ সরকার চায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে এআই ব্যবহারের সুযোগ ও ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান শুরু হোক, তবে কিছু সমালোচক মনে করেন, এআই অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছোট শিশুদের পাঠ্যক্রমেও।
তথ্যসূত্র: বিবিসি

