রাশিয়ায় অভিবাসীকে হুমকি
‘ইউক্রেনে যুদ্ধে না গেলে জেলে দলবদ্ধ ধর্ষণ করবে এইডস আক্রান্তরা’

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বাধ্যতামূলক এক বছরের সামরিক ট্রেনিংয়ে যোগ দিতে নির্ধারিত ইউনিটে যাওয়ার আগে বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ট্রিনিটি ক্যাথেড্রালে প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছেন সেনাসদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ। শহরটিতেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্ম। সেই শহরে কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী হিসেবে কাজ করতেন ২৬ বছর বয়সী হুশরুজন সালোহিদিনভ। তিনি তাজিকিস্তানের নাগরিক।
তাজিকিস্তানের এই মুসলিম যুবক জানান, গত বছর একটি পার্সেল সংগ্রহ করতে গেলে গ্রেপ্তার হন তিনি। পুলিশের দাবি, বয়স্ক নারীদের কাছ থেকে চুরি করা অর্থ ছিল পার্সেলটিতে।
সালোহিদিনভ বলেছেন, অভিযুক্ত অপরাধীদের সঙ্গে কখনো সরাসরি যোগাযোগ ছিল না তার। তবুও সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে ক্রেস্টি-২ প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয় তাকে। দুর্বল প্রমাণের কারণে তার বিরুদ্ধে বিচার শুরু করতে অস্বীকৃতি জানায় আদালত।
সালোহিদিনভের অভিযোগ, মুক্তি দেওয়ার পরিবর্তে কারা কর্তৃপক্ষ ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে তাকে। তারা হুমকি দেয়, তাকে রাখা হবে এইচআইভি আক্রান্ত বন্দিদের সঙ্গে একই সেলে । সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হতে পারে দলবদ্ধভাবে। একমাত্র স্বেচ্ছায় ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে রাজি হলেই এই শাস্তি এড়াতে পারবেন তিনি।
‘তারা বলেছিল, তোমাকে এখন স্কার্ট পরিয়ে দেওয়া হবে, তারপর করা হবে ধর্ষণ’, বলেছেন সালোহিদিনভ
তাজিক এই যুবক জানান, একই সঙ্গে প্রলোভনও দেখানো হয়, যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সাইনিং বোনাস দেওয়া হবে ২০ লাখ রুবেল (২৬ হাজার ডলার) এবং ২ লাখ রুবেল দেওয়া হবে প্রতি মাসে। পাশাপাশি সব অভিযোগ থেকে মুক্তি তো রয়েছেই!
শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের শরৎকালে আর কোনো উপায় না পেয়ে চুক্তিতে সই করেন সালোহিদিনভ। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে বন্দি হন তিনি। এরপর থেকে উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের একটি বন্দি শিবিরে রাখা হয়েছে তাকে।
এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি কেস্টি-২ কারাগার, সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রসিকিউটর অফিস এবং রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
অভিবাসদের ফাঁদে ফেলার অভিযান
মানবাধিকার সংস্থা, গণমাধ্যম ও রুশ কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সালোহিদিনভের মতো মধ্য এশিয়ার হাজার হাজার শ্রমিক অভিবাসীকে বাধ্য করা হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে।
ইউক্রেনভিত্তিক সংগঠন হোচু জিত জানিয়েছে, এ ধরনের হাজারো সেনার তালিকা তারা যাচাই করে প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, এসব সৈন্যকে প্রায় মৃত্যুর মুখে পাঠানো হচ্ছে।
রাশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তান থেকে আসা লাখো শ্রমিক। তবে ২০২৩ সাল থেকে—ইউক্রেন আক্রমণের পর বাড়ে অভিবাসীদের ধরপাকড়। যাদের চেহারা রুশদের মতো নয় তাদের আটক করা হচ্ছে নানা অভিযোগে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সরাসরি পাঠানো হয় সৈনিক নিয়োগকেন্দ্রে।
২০২৫ সালে আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরেক তাজিক নাগরিক জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ কাজের অনুমতিপত্রের কারণে তাকে আটক করে নির্যাতনের মাধ্যমে বাধ্য করা হয় স্বেচ্ছাসেবী হতে। বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী গালিগালাজও সহ্য করতে হয় তাকে।
অভিবাসীরা অভিযোগ করেন, তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং হুমকি দেওয়া হয় জেল বা পরিবারের সদস্যদের বহিষ্কারের।
লন্ডনভিত্তিক সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্স থিংক ট্যাংকের প্রধান আলিশের ইলখামভ বলেছেন, অভিবাসীদের সবচেয়ে বেশি নিয়োগের উপায় হচ্ছে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর ভয় দেখানো।
কখনো কখনো তাদের নিয়োগ করা হয় প্রতারণার মাধ্যমেও। সালোহিদিনভ জানান, এক উজবেক সদস্য ছিলেন তার ইউনিটে। রুশ ভাষা জানতেন না তিনি। পরে না জেনে অভিবাসন কেন্দ্রের কাগজে সই করতে গিয়ে প্রতারিত হয়ে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে যান তিনি।
২০২৫ সালের মে মাসে রাশিয়ার প্রধান প্রসিকিউটর আলেক্সান্ডার বাস্ত্রিকিন বলেছেন, ২০২৫ সালে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে ২০ হাজার মধ্য এশীয়কে। আগের বছর যার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মধ্য এশীয়রা সহজ টার্গেটে পরিণত হন, কারণ তাদের নিজ দেশগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল।
এ ছাড়া রাশিয়ায় স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশ নিতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সরকার অভিবাসীদের দিকে আরও বেশি ঝুঁকছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।


