সাগরের শহরে নেই সুপেয় পানি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সত্তরের দশকে কক্সবাজার শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক ছিল পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র। সেই সময়ের অভিজাত আবাসিক হোটেল ‘মারমেইড’-এ একসময় পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকত। এখন তিনতলা ভবনের ২০টি কক্ষের বেশিরভাগই খালি পড়ে থাকে। শুক্রবারের ছুটির দিনেও মেলেনি কোনো বোর্ডার। হোটেলটির ব্যবস্থাপক নুরুল হক জানালেন, সংকটটা ব্যবসার নয়, বিশুদ্ধ পানির।
হোটেলের নিজস্ব টিউবওয়েলে এখন লবণাক্ত পানি ওঠে। অতিথিরা এসে গোসল বা ব্যবহার করতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে চলে যান। ওজু করার জন্যও বাইরে যেতে হয়— আক্ষেপ জানান তিনি।
শুধু একটি হোটেলের গল্প নয়, এটি এখন পুরো কক্সবাজার শহরের বাস্তবতা। সমুদ্রঘেরা এ পর্যটন নগরীতে সবচেয়ে বড় সংকট এখন নিরাপদ সুপেয় পানি।
বঙ্গোপসাগরের উপকূল জুড়ে পর্যটন শহর কক্সবাজার। জেলার প্রধান নদী ও খালগুলোর মধ্যে রয়েছে মাতামুহুরী, নাফ, বাঁকখালী ও ঈদগাঁও-ফুলেশ্বরী নদী। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে রেজুখাল, মহেশখালী চ্যানেল, কুতুবদিয়া চ্যানেল, উজানটিয়া খাল, ভরুয়াখালী খাল, ভোলা খাল, অমাবস্যাখালী খাল, কোহেলিয়া খাল ও পাতিলা খাল উল্লেখযোগ্য। সাগর-নদী-খাল বিশাল জলরাশিবেষ্টিত এ জেলায় এখন সুপেয় পানি নেই। অর্থাৎ পানির জেলায় পানি নেই!
সকাল মানেই পানির অপেক্ষা: কক্সবাজার শহরের অনেক এলাকায় এখন সকাল শুরু হয় এক অদ্ভুত দৃশ্যে। কারও হাতে জেরিকেন, কারও হাতে বালতি বা কলসি। সবাই তাকিয়ে থাকে রাস্তার দিকে। কখন আসবে পানির গাড়ি।
গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। বিশুদ্ধ কি না, সেটি এখন আর মুখ্য নয়। যেভাবেই হোক কিছু পানি সংগ্রহ করাই যেন বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শহরটি একসময় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর সাগরভাঙনের আতঙ্কে কাঁপত। এখন সেই শহরের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ, ভূগর্ভে লবণাক্ততার আগ্রাসন।
কোথাও নলকূপে সুপেয় পানি নেই। কোথাও উঠছে লবণাক্ত পানি। কোথাও আবার আয়রনের মাত্রা এত বেশি যে, সেই পানি পান অনুপযোগী।
প্রতিদিন ৩৫ কোটি লিটার পানির চাহিদা: কক্সবাজার জেলায় স্থায়ী জনসংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ ৮৩ হাজার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তত ১৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। সব মিলিয়ে প্রতিদিন জেলায় প্রায় ৩৫ কোটি লিটার মিঠাপানির প্রয়োজন হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ৮০ লিটার পানি প্রয়োজন। কিন্তু কক্সবাজারের বড় অংশে এখন সেই ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার পৌর এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ২৭৮টি গভীর নলকূপ। এর মধ্যে সচল রয়েছে অর্ধেকের কম। বাকি নলকূপগুলোর অনেকটিতে এখন আর পর্যাপ্ত পানি ওঠে না। কিংবা ওঠে লবণাক্ত পানি।
২০ বছরে ৯০ ফুট নিচে পানিস্তর: কক্সবাজার পৌরসভা ও ডিপিএইচইর তথ্য বলছে, গত দুই দশকে কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে ৭০ থেকে ৯০ ফুট পর্যন্ত। ২০০৫ সালে যেখানে ১২০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যেত, সেখানে এখন অনেক এলাকায় ৩৫০ থেকে ৫০০ ফুট ড্রিল করেও মিলছে না পানি। টেকনাফ ও উখিয়ার কিছু এলাকায় এ গভীরতা ৭০০ থেকে ৭৮০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছেছে।
ডিপিএইচইর উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, ‘পৌর শহরের ১ থেকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডে পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নিচে নেমেছে। শুষ্ক মৌসুমে বহু নলকূপ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও পানির সঙ্গে লবণাক্ততা ও আয়রনের মাত্রাও বেড়ে গেছে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভে পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ায় সেখানে তৈরি হচ্ছে ‘হাইড্রোলজিক্যাল ভ্যাকুয়াম’। আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে বঙ্গোপসাগর ও বাঁকখালী নদীর লবণাক্ত পানি। বিজ্ঞানভিত্তিক ভাষায় একে বলা হয় ‘সি ওয়াটার ইনট্রুশন’।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ বলেছেন, ‘যে গতিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমছে, তা চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে কক্সবাজার শহরে নিরাপদ লবণমুক্ত পানি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়ছে চাপ: উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ রোহিঙ্গার জন্য প্রতিদিন কয়েক কোটি লিটার পানি তোলা হয় গভীর নলকূপ থেকে।
ডিপিএইচই সূত্র বলছে, ক্যাম্প এলাকায় গত কয়েক বছরে বসানো হয়েছে শত শত গভীর নলকূপ। এতে আশপাশের স্থানীয় এলাকাগুলোর পানিস্তরও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
উখিয়া উপজেলার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তারের অভিযোগ, আগে ১০০-১৫০ ফুটে পানি মিললেও এখন অনেক এলাকায় ৪০০ ফুটের নিচে গিয়েও পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
লবণাক্ত পানি বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি: কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চিকিৎসক অসীম সূত্রধরের মতে, ‘দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি পান করলে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা, ত্বক ও চোখের রোগসহ নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের ঝুঁকি আরও বেশি। অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে ধীরে ধীরে নীরব বিপর্যয় তৈরি করে।’ তার দাবি, কক্সবাজারে উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনিসংক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
১৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে আশার আলো: কক্সবাজার পৌরসভায় এ সংকট মোকাবিলায় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ঝিলংজায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক পানি শোধনাগার। বাঁকখালী নদীর পানি ছয় ধাপে পরিশোধন করে তা পুরো পৌর এলাকায় সরবরাহের কার্যক্রম চলছে।
প্রকল্প পরিচালক গোলাম মোক্তাদির জানিয়েছেন, প্রকল্পটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ লিটার। এরই মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে ৬৮ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার পাঁচটি ওয়াটার ট্যাংক। পাইপলাইন স্থাপনের বড় অংশের কাজও শেষ। তিনি জানান, ধাপে ধাপে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় এ পানি সরবরাহ সম্প্রসারণ করা হবে।
শুধু প্রকল্প নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলামের মতে, কক্সবাজারের পানি সংকট শুধু প্রাকৃতিক নয়, এটি পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও অব্যবস্থাপনারও ফল।
সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিনের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে কক্সবাজারের বড় অংশে নলকূপ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় লবণাক্ততা বেড়েছে কয়েকগুণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের লবণাক্ততা বাড়ছে। অনাবৃষ্টিতে পানির স্তর নামছে আরও নিচে।




