ব্রিটেনের খাদ্যব্যবস্থায় বিপদের ঘণ্টা
- গুদাম নেই, আমদানিনির্ভর বাজার
- যুদ্ধ-জলবায়ু-সাইবার হামলা, একটি বড় ধাক্কাই যথেষ্ট
- খাবারকে অস্ত্র বানাতে পারে বিশ্ব, অথচ ভয়াবহ সংকটের জন্য প্রস্তুত নয় ব্রিটেন, সতর্কতা ১৮০ বিশেষজ্ঞের

লন্ডনের বিপণিবিতানে আলো জ্বলছে, তাকজুড়ে খাবারও আছে। কিন্তু বন্দর থেমে গেলে, বিদ্যুৎব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেলে, সফটওয়্যার অচল হলে কিংবা যুদ্ধ ও জলবায়ু বিপর্যয়ে বিদেশ থেকে খাদ্য আসা বন্ধ হলে সেই তাক কত দিন ভরা থাকবে? ব্রিটেনের ১৮০ বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা বলেছে, উত্তরটি স্বস্তির নয়। বড় ধরনের খাদ্যসংকট দেখা দিলে দেশটির মানুষকে খাওয়ানোর পর্যাপ্ত পরিকল্পনাই নেই।
মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাবিদ, কৃষক, স্থানীয় কাউন্সিলের নেতা ও খাদ্য সহায়তাকর্মীসহ ১৮০ জন বিশেষজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের কাছে এক খোলা চিঠিতে এ সতর্কতা দিয়েছেন। তাঁদের ভাষায়, খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনায় ব্রিটেন দীর্ঘদিন ধরে “আত্মতুষ্ট” থেকেছে।
চিঠিতে জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা, মুক্তিপণভিত্তিক সাইবার হামলা, সফটওয়্যারের বিপর্যয় ও অপতথ্যকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, ভবিষ্যতে “খাদ্যকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে”। ব্রিটেনের খাদ্যব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। টেলিগ্রাফের হিসাবে, দেশটির প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ খাবার বিদেশ থেকে আসে।
ঝুঁকির আরেকটি জায়গা হলো প্রয়োজনমাফিক তাৎক্ষণিক সরবরাহের ব্যবস্থা। এতে বড় মজুত না রেখে খামার ও বন্দর থেকে খাবার প্রায় সরাসরি বিপণিবিতানের তাকে পৌঁছে যায়। খাদ্যনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টিম ল্যাংয়ের ব্যাখ্যায়, ক্রেতা দোকানে একটি পণ্য কেনার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল ব্যবস্থা পরবর্তী সরবরাহের নির্দেশ দেয়। ফলে স্বাভাবিক সময়ে ব্যবস্থা দ্রুত ও সাশ্রয়ী হলেও বড় ধরনের বিপর্যয়ে মজুতের অভাব বিপদ ডেকে আনতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনে ৬৭টি গুদামে প্রায় দুই লাখ টন কৌশলগত খাদ্য মজুত রাখা হতো। নব্বইয়ের দশকে সেই ব্যবস্থা পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়। এখন সরকারের পরামর্শ, প্রতিটি পরিবার জরুরি পরিস্থিতির জন্য অন্তত ৭২ ঘণ্টার খাবার ঘরে রাখবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আপত্তি এখানেই। সরকারের ২০২৬ সালের নিজস্ব জরিপে ২৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, অর্থের অভাবে তাঁরা আরও ভালোভাবে জরুরি প্রস্তুতি নিতে পারেননি।
তুলনায় সুইজারল্যান্ড গম, চাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও কফিসহ কয়েক মাসের খাদ্য বাধ্যতামূলকভাবে মজুত রাখে এবং সেই সক্ষমতা আরও বাড়াচ্ছে। চীনেরও বিশাল জাতীয় শস্যভান্ডার রয়েছে। বিশেষজ্ঞেরা তাই ব্রিটেনেও জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য মজুতব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ সহনশীলতা নিয়ে একটি জাতীয় পরিষদ গঠন, বড় খাদ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি যাচাই, স্থানীয় খাদ্য সহনশীলতা কমিটি তৈরি এবং দেশে ডাল, শাকসবজি, ফল ও বাদামের উৎপাদন বাড়ানো। খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন ও ঘাটতিকে জাতীয় ঝুঁকির তালিকায় আলাদা বিপদ হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ব্রিটিশ সরকারের ২০২৪ সালের খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিবেদনও স্বীকার করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার একক দুর্বল কেন্দ্রগুলো দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সাম্প্রতিক বড় ধাক্কাগুলোর মধ্যেও ব্রিটেনে দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যঘাটতি দেখা যায়নি। অর্থাৎ বিপদ এখনও ভবিষ্যতের আশঙ্কা, বর্তমানের দুর্ভিক্ষ নয়।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের শেষ কথায় রয়েছে তাগিদের সুর। তাঁদের বক্তব্য, সামনে যে যুগ আসছে সেখানে সবাইকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া সহজ হবে না। খাদ্য নিরাপত্তাকে এড়িয়ে গেলে চলবে না, তাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে আনতে হবে।
কারণ সভ্য শহরে দুর্ভিক্ষের শুরু সব সময় খালি থালা দিয়ে হয় না। কখনও তা শুরু হয় পূর্ণ বিপণিবিতানের সামনে দাঁড়িয়ে এই বিশ্বাস থেকে যে, আগামীকালও তাকগুলো ঠিক আজকের মতোই ভরা থাকবে৷



