৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড ঋণের ‘বারুদের স্তূপে’ ব্রিটেন, এক ভুলেই বিস্ফোরণ?
- সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৯৫ শতাংশ, সুদ মেটাতেই বছরে শত বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি নতুন সরকারের বাড়তি খরচ ও ঋণের পরিকল্পনা নিয়ে নজর বন্ডবাজারের

ছবি: রয়টার্স
ঋণের অঙ্ক প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড। শুধু সেই ঋণের সুদ মেটাতেই বছরে চলে যাচ্ছে ১০০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। তার মধ্যেই জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, প্রতিরক্ষা বাড়ানো, আবাসন ও অবকাঠামোয় নতুন বিনিয়োগ–একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে পা রেখেছেন নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
এই অবস্থাকে কার্যত ‘বারুদের স্তূপ’ বলে সতর্ক করেছেন প্রবীণ ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার অ্যান্ড্রু নিল। তার আশঙ্কা, সরকারি অর্থব্যবস্থায় একটি ভুল পদক্ষেপও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নাড়িয়ে দিলে ঋণ নেওয়ার খরচ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। আর তখন অর্থনীতি সামলানো নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য অনেক কঠিন হয়ে উঠবে।
শনিবার (৮ আগস্ট) ডেইলি মেইলে প্রকাশিত কলামে নিলের বক্তব্য, ব্রিটেনের আর্থিক অবস্থার সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু ঋণের পরিমাণ নয়; বরং সেই ঋণ বহন করার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং নতুন সরকারকে ঘিরে বাজারের প্রত্যাশা।
সত্যিই কি ঋণ ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড?
সরকারি হিসাব বলছে, সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত নয়। যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর ওএনএসের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে, চলতি বছরের জুন মাসের শেষে সরকারি খাতের নিট ঋণ ছিল ২ দশমিক ৯৮৯৯ ট্রিলিয়ন পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন। এক বছর আগের তুলনায় ঋণ বেড়েছে ১২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড। ঋণের পরিমাণ এখন ব্রিটিশ মোট দেশজ উৎপাদনের ৯৪ দশমিক ৯ শতাংশ; অনুপাতটি এমন উচ্চতায় রয়েছে, যা সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে। অর্থাৎ, ব্রিটেন বছরে যত পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে তার প্রায় সমান অঙ্কের সরকারি ঋণ এরই মধ্যে জমে আছে।
সুদের বিলেই বিপুল অর্থ
ঋণের আরেকটি চাপ সুদ। ব্রিটেনের স্বাধীন বাজেট পর্যবেক্ষক সংস্থা অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটির (ওবিআর) মার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় প্রায় ১০৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ড। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও তা প্রায় ১০৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন পাউন্ড হতে পারে। ২০৩০-৩১ সালে সেই অঙ্ক বেড়ে ১৩৭ দশমিক ১ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। মহামারির আগের দশকের তুলনায় জাতীয় আয়ের অংশ হিসেবে এখন ঋণের সুদ প্রায় দ্বিগুণ।
এখানেই নিলের ‘বারুদের স্তূপ’ উপমার অর্থ স্পষ্ট। সরকার নতুন হাসপাতাল, স্কুল, প্রতিরক্ষা বা করছাড়ে যে অর্থ ব্যয় করতে পারত, তার বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে অতীতে নেওয়া ঋণের সুদে।
আর সুদের হার সামান্য বাড়লেও চাপ দ্রুত বাড়তে পারে ৷ ওবিআরের হিসাবে, সরকারি বন্ডের সুদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের প্রত্যাশা এক শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে গেলে ২০৩০-৩১ সালে সরকারের বার্ষিক ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন প্রায় ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
বার্নহ্যাম এলেন, বাজার সঙ্গে সঙ্গেই নড়ল
এই আশঙ্কা শুধু তাত্ত্বিক নয়। গত ২০ জুলাই অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দিনই তার বক্তব্যের পর ব্রিটিশ সরকারি বন্ডের দাম পড়ে এবং ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায়। ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ফলন সেদিন ৮ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৫ দশমিক ০৪ শতাংশে ওঠে। ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ফলন পৌঁছে যায় ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশে। রয়টার্স জানিয়েছিল, বার্নহ্যাম সরকারের আর্থিক নীতি কিছুটা শিথিল হতে পারে, এই আশঙ্কাই বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়ার অন্যতম কারণ।
পরের দিন ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ফলন আরও বেড়ে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশের কাছাকাছি, দুই মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তখনো বাজারের প্রধান প্রশ্ন ছিল– নতুন সরকার যে বাড়তি ব্যয়ের কথা বলছে, তার অর্থ আসবে কোথা থেকে?
ব্রিটেনের সরকারি বন্ডের ফলন বর্তমানে উন্নত সাত অর্থনীতির জোট জি৭-এর মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের। ফলে বাজারে আস্থা নষ্ট হলে লন্ডনের জন্য নতুন ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ক্ষমতায় এসেই খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি
বার্নহ্যাম দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত কয়েকটি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত সামনে এনেছেন। গৃহস্থালির বিদ্যুৎ বিলে মূল্য সংযোজন কর কমানো, ইংল্যান্ডে একক বাসভাড়া সর্বোচ্চ ২ পাউন্ডে বেঁধে দেওয়া এবং পাব, ক্লাব ও সরাসরি গানের অনুষ্ঠানস্থলের ব্যবসায়িক কর ২০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা তার প্রথম দিকের পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে। পাব ও গানের অনুষ্ঠানস্থলে করছাড়ের প্যাকেজটির মূল্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড।
বার্নহ্যাম এসব পদক্ষেপকে জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপে থাকা মানুষের জন্য ‘স্বস্তি’ দেওয়ার নীতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে অর্থনীতিবিদ ও বাজারের নজর অন্য জায়গায় এসব প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, সামাজিক সেবা, আবাসন ও অবকাঠামোতেও যদি ব্যয় বাড়ে, তবে সরকারের আর্থিক নিয়ম মেনে সেই অর্থ কীভাবে জোগাড় করা হবে।
আরও ঋণ নেওয়ার পথ খুঁজছে ট্রেজারি
এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে সাম্প্রতিক এক খবরে। রয়টার্স গত বুধবার (৫ আগস্ট) জানিয়েছে, ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সরকারের আর্থিক নিয়মে থাকা সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড ঋণ নেওয়া যায় কি না, তা পরীক্ষা করছেন। সম্ভাব্য বাড়তি অর্থ অবকাঠামো, আবাসন ও ব্যবসায় বিনিয়োগে ব্যবহার হতে পারে। অর্থমন্ত্রী জন হিলি বলেছেন, আরও বেশি এবং দ্রুত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
বার্নহ্যাম অবশ্য এর আগেই বলেছেন, তিনি বিদ্যমান আর্থিক নিয়ম মেনে চলবেন এবং বাজেট শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন; তবে নিয়মের মধ্যে যতটা সুযোগ আছে, তা কাজে লাগাতে চান। তার সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে ২৮ অক্টোবর। ফলে বাজারের পরবর্তী বড় পরীক্ষা হতে পারে সেই বাজেট।
কেন ফিরে আসছে লিজ ট্রাসের স্মৃতি
ব্রিটিশ রাজনীতিতে সরকারি ঋণ ও বন্ডবাজারের কথা উঠলেই ফিরে আসে ২০২২ সালের লিজ ট্রাস অধ্যায়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের সরকারের অর্থের সংস্থান পরিষ্কার না করেই বড় করছাড় ঘোষণার পর সরকারি বন্ডবাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে, বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড কেনার জরুরি কর্মসূচি চালু করতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরে জানিয়েছিল, ওই অভিযানে মোট ১৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ডের বন্ড কেনা হয়েছিল।
সেই অভিজ্ঞতা এখনো বিনিয়োগকারীদের মনে তাজা। রয়টার্সও বলছে, উচ্চ সরকারি ঋণের পাশাপাশি ২০২২ সালের ‘মিনি-বাজেট’ সংকটের স্মৃতি ব্রিটিশ বন্ডবাজারকে নতুন সরকারের আর্থিক ঘোষণার ব্যাপারে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে রেখেছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি ট্রাস আমলের পুনরাবৃত্তি–এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো ঘটনা এখনো ঘটেনি। বার্নহ্যাম সরকার এখন পর্যন্ত আর্থিক নিয়ম মেনে চলার কথাই বলছে, আর নতুন অর্থমন্ত্রী জন হিলির নিয়োগকেও বাজারের একাংশ তুলনামূলক ইতিবাচকভাবে নিয়েছে।
নিলের সংশয় বার্নহ্যামের অভিজ্ঞতা নিয়েও
অ্যান্ড্রু নিলের কলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশটি নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে। তার আশঙ্কা, এত জটিল আর্থিক পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বার্নহ্যামের প্রস্তুতি যথেষ্ট কি না।
নিল আগেও বার্নহ্যামের অর্থনৈতিক কর্মসূচির নির্দিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জুনে টাইমস রেডিওতে তিনি বলেছিলেন, বার্নহ্যামের বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকলেও সেই লক্ষ্য পূরণে স্বতন্ত্র ও বিস্তারিত নীতির ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে বার্নহ্যাম নিজে জোর দিয়ে বলেছেন, তার সরকার আর্থিক শৃঙ্খলা ভাঙবে না। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দৈনন্দিন সরকারি ব্যয় করের আয় দিয়ে মেটানোর বিদ্যমান নিয়ম বজায় রাখবেন। তবে একই সঙ্গে তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো বাড়াতে নিয়মের ভেতরের ঋণ নেওয়ার সুযোগও কাজে লাগাতে চান।
আসল পরীক্ষা ২৮ অক্টোবর
ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতিকে এখনই ‘বিস্ফোরণের মুখে’ বলা তথ্যগতভাবে বেশি দূর যাওয়া হবে। সেটি অ্যান্ড্রু নিলের সতর্কতামূলক মূল্যায়ন।
কিন্তু তার উদ্বেগের পেছনের সংখ্যাগুলো বাস্তব–ঋণ প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড, ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৯৫ শতাংশ, বছরে শত বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি সুদের বিল এবং উন্নত বিশ্বের মধ্যে তুলনামূলক চড়া সরকারি ঋণের খরচ।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন চাইছেন একসঙ্গে দুটি কাজ করতে— মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ানো; আবার বাজারকেও বোঝানো, সরকারের হিসাবের খাতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না।
সেই ভারসাম্য কতটা রাখতে পারবেন ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী, তার প্রথম বড় উত্তর মিলবে ২৮ অক্টোবরের বাজেটে। কারণ দেশটির ঋণের পাহাড়ে এখন শুধু কত টাকা খরচ করা হচ্ছে, সেটাই নয়– বাজার সেই খরচকে কতটা বিশ্বাস করছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।




