প্রশান্ত মহাসাগরে তাপের দাপট, ঝড়বৃষ্টির শঙ্কায় ব্রিটেন
চার দশকের নজির ভাঙতে পারে এল নিনো, সতর্কবার্তা জাতিসংঘের
- শীতের শুরুতে বাড়তে পারে বৃষ্টি ও ঝড়
- তীব্র ঠান্ডার আশঙ্কা

সংগৃহীত ছবি
প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে বাড়ছে অস্বাভাবিক উষ্ণতা। তার অভিঘাত পৌঁছাতে পারে হাজার হাজার মাইল দূরের ব্রিটেনেও। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ খরা। শীতের শুরুতে ঝড়ের আশঙ্কা, শেষভাগে হঠাৎ তীব্র ঠান্ডার সম্ভাবনা। পৃথিবীর আবহাওয়ার এই অস্থিরতার কেন্দ্রে প্রাকৃতিক জলবায়ুপ্রক্রিয়া এল নিনো। জাতিসংঘের সতর্কতা, এবারের ঘটনাটি শক্তিতে গত চার দশকের অভিজ্ঞতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রয়টার্স ও দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করেছেন এল নিনোর ব্যতিক্রমী তীব্রতা নিয়ে। তার ভাষায়, এর শক্তি ‘অভূতপূর্ব’ হতে পারে। কিছু অঞ্চলে তাপপ্রবাহ ও খরা বাড়তে পারে। অন্য কোথাও প্রবল বৃষ্টিতে দেখা দিতে পারে বন্যা।
এল নিনো কী?
নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের উপরিভাগের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় দীর্ঘ সময় উষ্ণ থাকলে এই প্রাকৃতিক ঘটনা তৈরি হয়। সাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তনে বদলে যায় বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টির ধরন। দূরের মহাদেশেও তার প্রভাব পড়ে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ৮ অক্টোবরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। আশঙ্কা রয়েছে ডিসেম্বরে এল নিনোর শক্তি সর্বোচ্চ হওয়ার। এর প্রভাব গড়াতে পারে ২০২৭ সালেও।
ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ের কিছু এলাকায় প্রবল বৃষ্টিতে বেড়েছে নদীর পানি। ঘর ছাড়তে হয়েছে বহু মানুষকে। ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে দাবানলের পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়েছে বলে জানিয়েছে ইন্ডিপেনডেন্ট।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও আশঙ্কা রয়েছে বৃষ্টির ঘাটতির। কৃষি, পানীয় জল ও খাদ্য উৎপাদনে চাপ পড়তে পারে। বিশ্ববাজারে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে ব্রিটেনেও পৌঁছাতে পারে তার প্রভাব।
তবে ব্রিটেনে কী ঘটবে?
ব্রিটিশ আবহাওয়া দপ্তরের মতে, শরতের শেষভাগ ও শীতের শুরুতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া এবং অপেক্ষাকৃত মৃদু আবহাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। শীতের পরবর্তী সময়ে ঊর্ধ্ববায়ুমণ্ডলের মেরুঘূর্ণি দুর্বল হলে আকস্মিক উষ্ণায়নের প্রভাবে তীব্র ঠান্ডার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ আবহাওয়া দপ্তরের মৌসুমি বিশ্লেষণে উষ্ণ ও বৃষ্টিবহুল শরতের সম্ভাবনা স্বাভাবিকের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি বলা হয়। তবে এটি দীর্ঘ সময়ের প্রবণতার হিসাব। কোনো নির্দিষ্ট দিনে বন্যা হবে, এমন নিশ্চয়তা নয়।
ব্রিটিশ আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম স্কেইফ জানিয়েছেন, এত তীব্র এল নিনোর পূর্বাভাস আগে দেখেননি তিনি। বিজ্ঞানী নিক ডানস্টোনের আশঙ্কা, সমুদ্রের বাড়তি তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ায় ২০২৭ সাল বিশ্বে উষ্ণতম বছর হয়ে উঠতে পারে।
তবে তুষারঝড় আসবেই, এমন পূর্বাভাস দেয়নি আবহাওয়া দপ্তর। তাদের প্রধান আবহাওয়াবিদ ইয়ান লিস্ক মনে করিয়ে দিয়েছেন, এল নিনো ব্রিটেনের আবহাওয়ার একমাত্র নিয়ামক নয়। কোন শহরে কবে কত বৃষ্টি হবে, এখনই তা বলা সম্ভব নয়।
এল নিনো প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের অংশ। কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ওপর এর বাড়তি তাপ যুক্ত হলে বিপদ বাড়তে পারে। দুটি ঘটনা এক নয়।
প্রশান্ত মহাসাগরের পানি ব্রিটেনের তীরে এসে পৌঁছাবে না। কিন্তু তার উষ্ণতার প্রভাব পৌঁছাতে পারে আকাশে, মেঘে, বাতাসে। প্রশ্ন এখন একটাই: প্রকৃতির এই দূরবর্তী সংকেতের জন্য কতটা প্রস্তুত পৃথিবী?



