বিশ্ববাজারে নতুন 'তেলশক্তি' চীন
- ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ফেব্রুয়ারি থেকে জুনে দিনে প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি কমিয়েছে বেইজিং
- বিশাল মজুদ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও তেলের চাহিদা কমানোর ক্ষমতাই বদলে দিচ্ছে বিশ্ববাজারের পুরনো সমীকরণ

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ চীন।
তেল উৎপাদনের কথা উঠলেই এতদিন চোখ যেত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ওপেকের দিকে। কিন্তু বিশ্ব তেলের বাজারে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে এমন এক দেশে, যেটি নিজেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক৷ সেই দেশ চীন। কখন তেল কিনবে, কতটা কিনবে, কতটা মজুদ থেকে ছাড়বে, দেশে কতটা পরিশোধন করবে কিংবা কতটা জ্বালানি বিদেশে বিক্রি করবে–এই সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে বেইজিং এখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম পর্যন্ত নড়ানোর ক্ষমতা দেখাচ্ছে। রবিবার প্রকাশিত দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ বলেছে, ইরান যুদ্ধ সেই ক্ষমতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে পারস্য উপসাগরের বিপুল তেল সরবরাহ আটকে পড়ে। অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। কিন্তু সেই আশঙ্কা বাস্তব হয়নি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইন দিয়ে কিছু তেল বের করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান জরুরি মজুদ থেকেও তেল ছেড়েছে। তবে ইকোনমিস্টের হিসাবে, বড় ভূমিকা রেখেছে চীনের একটি প্রায় নিঃশব্দ সিদ্ধান্ত, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে দেশটি অপরিশোধিত তেলের আমদানি প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ দিনে প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল কমিয়ে দেয়। বিশ্লেষকদের অনুমান, শুধু এই পদক্ষেপই ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলার বা তারও বেশি কম রাখতে সাহায্য করে থাকতে পারে।
রয়টার্সের সর্বশেষ তথ্যও সেই প্রবণতার সঙ্গে মেলে। গত পাঁচ বছরে চীন গড়ে দিনে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। কিন্তু এপ্রিলের পর থেকে গড় আমদানি নেমে এসেছে প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেলে। জুনে তা নেমেছিল প্রায় এক দশকের সর্বনিম্ন ৭১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে। জুলাইয়ে কিছুটা বেড়ে ৮৪ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল হলেও গত বছরের একই মাসের তুলনায় তা এখনো ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ কম। জুন ও জুলাই মিলিয়ে চীনের দৈনিক আমদানি যুদ্ধের আগের তিন মাসের গড়ের চেয়ে প্রায় ৪২ লাখ ব্যারেল কম ছিল।
চীনের এই ক্ষমতার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিপুল তেল মজুদ। গত কয়েক বছর ধরেই দাম কমলে ব্যাপক হারে অপরিশোধিত তেল কিনে রাখছে বেইজিং। ইকোনমিস্টের হিসাবে, ২০২৬ সালের শুরুর আগের ১২ মাসেই তুলনামূলক কম দামে আরও প্রায় ২০ কোটি ব্যারেল তেল কিনেছিল চীন। এর আগে থেকেই দেশটির মজুদ ছিল প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেলের কাছাকাছি। অন্যদিকে রয়টার্স-উদ্ধৃত বিশ্লেষকদের হিসাবে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুদ মিলিয়ে পরিমাণটি অন্তত ১২০ কোটি ব্যারেল হতে পারে। সঠিক সংখ্যা অবশ্য রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার কারণে চীন প্রকাশ করে না।
যুদ্ধের আগে ফেব্রুয়ারিতে চীন দিনে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করছিল। ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল ছিল তাৎক্ষণিক ব্যবহারের চেয়ে বেশি, মূলত মজুদ বাড়ানোর জন্য। যুদ্ধের পর প্রথমেই সেই অতিরিক্ত কেনাকাটা বন্ধ করে দেয় বেইজিং। এরপর এপ্রিলের শেষ থেকে মজুদ থেকেও তেল ব্যবহার শুরু হয়। ভরটেক্সার হিসাবে, জুলাই নাগাদ দৃশ্যমান স্থলভিত্তিক মজুদ প্রায় ৭ কোটি ব্যারেল কমেছে। ভাসমান মজুদ ও অন্যান্য অপ্রকাশিত সংরক্ষণাগারের হিসাব ধরলে তিন মাসে মোট প্রায় ১৫ কোটি ব্যারেল, অর্থাৎ দিনে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল মজুদ থেকে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
এর অর্থ দাঁড়ায়, শুধু নতুন মজুদ করা বন্ধ করা এবং পুরনো মজুদ ব্যবহার- এই দুই কৌশলেই দৈনিক প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল আমদানি কমাতে পেরেছে চীন। রয়টার্সের আরেক হিসাব বলছে, দেশটির মজুদ এত বড় যে দিনে ২০ লাখ ব্যারেল করে ব্যবহার করলেও তা শেষ হতে প্রায় দুই বছর লাগতে পারে, যদিও বাস্তবে বেইজিং মজুদ এত নিচে নামতে দেবে না।
এই মজুদ আরও বাড়ানোর অবকাঠামোও তৈরি করছে চীন। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নতুন ১১টি তেল সংরক্ষণকেন্দ্র যোগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১৬ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল।
বেইজিংয়ের দ্বিতীয় হাতিয়ার পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি। চীন এশিয়ার অন্যতম বড় পেট্রোল, ডিজেল ও বিমান জ্বালানি সরবরাহকারী। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চে সরকার দেশীয় তেল পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন রপ্তানি চুক্তি কমাতে এবং কিছু আগের চুক্তিও বাতিল করতে বলে। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এতে দেশে বেশি জ্বালানি রাখা সম্ভব হয়েছে, একই সঙ্গে বিদেশে বিক্রির জন্য অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের প্রয়োজনও কমেছে। ইকোনমিস্টের হিসাবে, শুধু বিমান জ্বালানি রপ্তানি কমানোর ফলেই দৈনিক ১২ লাখ থেকে ১৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে। আগস্টে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো জ্বালানি রপ্তানির বিধিনিষেধ শিথিল করেছে বেইজিং। পরিশোধনাগারগুলোকে হংকং ও ম্যাকাও বাদে প্রায় ২৭ লাখ টন জ্বালানি রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান জ্বালানি ও অন্যান্য সরবরাহ ধরলে আগস্টে মোট রপ্তানি ৩৬ থেকে ৩৭ লাখ টনের কাছাকাছি যেতে পারে। অর্থাৎ বাজার পরিস্থিতি বুঝে চীন এখন রপ্তানির কলও আবার খুলছে।
চীনের তৃতীয় শক্তিটি আরও দীর্ঘমেয়াদি–দেশের অর্থনীতি এমনভাবে বদলেছে যে পরিবহনে তেলের ওপর নির্ভরতা আগের তুলনায় দ্রুত কমানো সম্ভব হচ্ছে। জুনে চীনের পরিশোধনাগারগুলো আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দিনে প্রায় ২৭ লাখ ব্যারেল কম অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করেছে। পেট্রল উৎপাদন কমেছে ১৪ শতাংশ; ডিজেল ও বিমান জ্বালানির উৎপাদন কমেছে ২১ শতাংশ করে।
এর পেছনে বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত বিস্তার বড় কারণ। জুনে চীনে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির ৬২ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক বা হাইব্রিড। মে মাসের এক সপ্তাহের জাতীয় ছুটিতে মহাসড়কে বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জিংয়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। বড় শহরের মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে মেট্রো, সাইকেল ও বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি বেশি ব্যবহার করছেন। অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রার একটি অংশও দ্রুতগতির রেলপথ নিয়ে নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক গাড়ি, এলএনজি ট্রাক, উচ্চগতির রেল ও নগর মেট্রোর বিস্তার ২০১৯ সালের পর থেকে চীনে দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল সম্ভাব্য তেল-চাহিদা বৃদ্ধি ঠেকিয়েছে।
পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পেও বিকল্প খুঁজছে চীন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ন্যাফথা ও এলপিজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কিছু কারখানা কয়লা ও ইথেন ব্যবহার করে পলিমার তৈরির পথে গেছে। এতে তেলের ঘাটতি পুরো শিল্প উৎপাদনকে থামিয়ে দিতে পারেনি। ইকোনমিস্টের হিসাবে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের জিডিপি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে; প্রবৃদ্ধি মন্থর হলেও তার প্রধান কারণ তেলসংকট নয়, বরং দুর্বল বিনিয়োগ ও দীর্ঘদিনের আবাসন খাতের সমস্যা।
তাহলে কি ‘নতুন ওপেক’?
এখানেই ইকোনমিস্টের মূল যুক্তি। ওপেক এতদিন বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমিয়ে বা বাড়িয়ে দাম প্রভাবিত করেছে। চীন এখন উল্টো পথে একই ধরনের ক্ষমতা দেখাচ্ছে, আমদানি কমিয়ে বা বাড়িয়ে, মজুদ ভরে বা খালি করে, রপ্তানি বন্ধ বা চালু করে এবং দেশের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে।
আর পার্থক্যটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্তে অনেক দেশের সম্মতি লাগে; চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে বেইজিং তুলনামূলক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেই কারণেই একজন তেল ব্যবসায়ীর ভাষ্য উদ্ধৃত করে ইকোনমিস্ট চীনকে কার্যত ‘নতুন ওপেক’-এর সঙ্গে তুলনা করেছে। এটি অবশ্য আনুষ্ঠানিক কোনো মর্যাদা নয়; বরং বিশ্ব তেলের বাজারে চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব বোঝানোর উপমা।
চীনের দুর্বলতাও আছে। দেশটি এখনো তেলের জন্য আমদানির ওপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা দেশটির দৃশ্যমান তেল ব্যবহারের প্রায় ৭৪ শতাংশ। সেই আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্রপথে আসে। ফলে হরমুজ বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের দীর্ঘস্থায়ী সংকট চীনের জন্যও বড় ঝুঁকি।
আর বিপুল মজুদও অসীম নয়। ইকোনমিস্টে উদ্ধৃত ভরটেক্সা বিশ্লেষকের হিসাবে, বর্তমান হারে মজুদ ব্যবহার অব্যাহত রাখলে কয়েক মাস পর বেইজিংকে সংরক্ষিত তেলের মাত্রা নিয়ে সতর্ক হতে হবে। ফলে ওপেকের মতো বছরের পর বছর একই কৌশল ধরে রাখা চীনের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবু চলতি ইরান যুদ্ধ একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে। এশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার প্রায় পুরোটাই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একা চীনের আমদানি কমানোর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। জুলাইয়ে গোটা এশিয়ার আমদানি যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় দিনে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল কম ছিল; একই সময়ে জুন-জুলাইয়ে চীনের আমদানিও যুদ্ধ-পূর্ব গড়ের চেয়ে দৈনিক প্রায় ৪২ লাখ ব্যারেল কমেছে। রয়টার্স তাই বলেছে, এশিয়ার তেলের চাহিদা সামঞ্জস্য করার ভার কার্যত একাই বহন করছে চীন।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) পর্যন্ত বাজারও এখনো অস্থির। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার আশা আবার দুর্বল হওয়ায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৮ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে।
বিশ্বের তেলের রাজনীতি তাই আর শুধু কে সবচেয়ে বেশি তেল তোলে, সেই প্রশ্নে আটকে নেই। কে সবচেয়ে বেশি কেনে, কতটা মজুদ রাখে এবং প্রয়োজন হলে কত দ্রুত কেনা বন্ধ করতে পারে সেই ক্ষমতাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই নতুন খেলায় সবচেয়ে বড় নামটি ক্রমেই হয়ে উঠছে চীন।






