নিষেধাজ্ঞায় থামেনি চীন
আমেরিকার চাপেই কি আরও জোরালো হল বেইজিংয়ের বিজ্ঞানযাত্রা

যে দেয়াল দিয়ে পথ আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই দেয়ালের পাশ দিয়েই কি নতুন রাস্তা তৈরি করে ফেলল চীন? বিশ্ব প্রযুক্তি-যুদ্ধের মঞ্চে এখন এমনই প্রশ্ন ঘুরছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ধীর করা। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, উল্টো সেই চাপই চীনা সংস্থাগুলোকে আরও বেশি করে নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা চীনা প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক পেটেন্টে প্রায় ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে বলে একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। গবেষণাটি নিয়ে প্রকাশিত নীতিবিষয়ক নিবন্ধটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ এ প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে চীন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক বছর ধরে চীনের উন্নত প্রযুক্তি খাতে একাধিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত কম্পিউটিং প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থায় বেইজিংয়ের প্রবেশ সীমিত করার চেষ্টা করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের যুক্তি, এই পদক্ষেপ জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু নতুন গবেষণার দাবি, নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া চীনা সংস্থাগুলো গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের উল্লেখ থাকা পেটেন্টের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তি তৈরির জন্য তারা মৌলিক বিজ্ঞান ও নিজস্ব গবেষণার উপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি-স্বনির্ভরতার পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বেইজিং বহু বছর ধরেই সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং জীবপ্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে।
তবে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার ছবিটি একমুখী নয়। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, চীন গবেষণা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে দ্রুত এগোলেও উন্নত প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার, বিশ্বব্যাপী বাজার দখল এবং উচ্চমানের উদ্ভাবনে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। জীবপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষাতেও দেখা গেছে, চীন কিছু ক্ষেত্রে এগোলেও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিকীকরণ ও প্রতিভা আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ধরে রেখেছে।
চীনের প্রযুক্তি উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের একাংশ মনে করেন, উন্নত প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি সামরিক ও কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে চীনের দাবি, প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা তার উন্নয়ন থামাতে পারবে না; বরং নিজস্ব উদ্ভাবনের প্রয়োজন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব প্রযুক্তি রাজনীতিতে এখন তৈরি হচ্ছে এক নতুন বাস্তবতা, একদিকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তি অবরোধ, অন্যদিকে চীনের আত্মনির্ভর গবেষণার প্রচেষ্টা। ৭২ শতাংশ বৃদ্ধির এই তথ্য সেই প্রতিযোগিতারই নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।
প্রশ্ন এখন একটাই, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চীনের প্রযুক্তি-দৌড় থামানো যাবে, নাকি সেই চাপই তাকে আরও দ্রুত নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির পথে এগিয়ে দেবে?



