স্ক্রিন আসক্তি ও ঘরবন্দি শৈশবের মূল্য দিচ্ছে হংকং
- মহামারির মতো ছড়াচ্ছে শিশুদের চোখের রোগ
- ২০২৮ সালের মধ্যেই ৬৬% শিশুই পড়তে যাচ্ছে দৃষ্টি ঝুঁকিতে

প্রতীকী ছবি
শৈশবেই চোখের সামনে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ। স্ক্রিন আসক্তি ও ঘরবন্দি শৈশবের
মূল্য দিচ্ছে গোটা হংকং। বয়স মাত্র ছয়, অথচ মহামারির মতো চোখে কম দেখার সমস্যা শুরু হয়ে গিয়েছে অনেক শিশুর। শুধু বর্তমান নয়, আগামী দু’বছরের ছবি আরও উদ্বেগের। হংকংয়ের বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ২০২৮ সালের মধ্যে সেখানকার ৮ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৬৬ শতাংশই অদূরদর্শিতায় ভুগতে পারে। এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছে হংকং অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট প্র্যাকটিস অপটোমেট্রিস্টস। ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর একটি প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
৪ অক্টোবর, রবিবার প্রকাশিত ওই সমীক্ষার ফল এসেছে নভেম্বর ২০২৫ থেকে মে ২০২৬-এর মধ্যে হংকংয়ের আটটি প্রাথমিক স্কুলের ৩,৫০০-র বেশি পড়ুয়ার চোখ পরীক্ষা করে। সমীক্ষায় দেখা যায়, ছয় বছর বয়সী শিশুদের ৬৭ শতাংশের চোখে ‘হাইপারোপিক রিজার্ভ’ বা ভবিষ্যতে অদূরদর্শিতা ঠেকানোর স্বাভাবিক সুরক্ষা- ভাণ্ডার প্রস্তাবিত মাত্রার চেয়ে কম। তাদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ২৪ শতাংশ শিশুর চোখে অদূরদর্শিতা ধরা পড়েছে।
‘হাইপারোপিক রিজার্ভ’ বলতে জন্মের সময় শিশুদের চোখে থাকা স্বাভাবিক দূরদৃষ্টির প্রবণতাকে বোঝায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে চোখের গঠন বদলালে এই রিজার্ভ ধীরে ধীরে কমে। খুব তাড়াতাড়ি এই সুরক্ষা-ভাণ্ডার শেষ হয়ে গেলে অদূরদর্শিতার ঝুঁকি বাড়ে।
হংকং অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট প্র্যাকটিস অপটোমেট্রিস্টসের সভাপতি ও শিশুদের চোখের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা টাস্কফোর্সের প্রধান কুইনি ইপ সিউ-লাই বলেন, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে আট বছর বয়সীদের ৬০ শতাংশের বেশি অদূরদর্শিতায় ভুগতে পারে। তাঁর মতে, এটি শিশুদের চোখের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।
টাস্কফোর্সের সহ- সভাপতি বেনি ট্যাম বিং-টিন জানান, বাড়ির আয়তন, বাইরে কতটা সময় কাটানো হয়— এমন নানা বিষয় শিশুর হাইপারোপিক রিজার্ভের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর কথায়, এই রিজার্ভ জন্মগত এবং একবার কমে গেলে তা ফিরিয়ে আনা যায় না। অদূরদর্শিতাও একবার হলে পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করা জরুরি।
জুনে প্রকাশিত একটি আন্তঃসীমান্ত গবেষণাতেও হংকংয়ের শিশুদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের ছবি উঠে আসে। সাত বছর বয়সী শিশুদের গড় হাইপারোপিক রিজার্ভ ছিল মাত্র ৭৮ ডিগ্রি। ইউরোপে এই গড় ১৪৪ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৩২ ডিগ্রি।
অভিভাবকদের তাই তিন বছর বয়স থেকেই নিয়মিত শিশুদের পূর্ণাঙ্গ চোখ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের বেশি সময় বাইরে খেলতে দেওয়া, পর্দার সামনে সময় কমানো, বই পড়ার সময় সঠিক দূরত্ব ও ভঙ্গি বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারকেও শিশুদের অদূরদর্শিতা নিয়ন্ত্রণে নীতি তৈরি এবং সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সমস্যাটি যে অনেক অভিভাবকের নজরের বাইরে, তারও ইঙ্গিত মিলেছে অ্যাসোসিয়েশনের সেপ্টেম্বরের একটি পৃথক সমীক্ষায়। ৬৭ জন সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে করা ওই সমীক্ষায় দেখা যায় যে, প্রায় ৮০ শতাংশ অভিভাবক শিশুর চোখ পরীক্ষা করান তখনই, যখন তারা নিজেরা চোখের সমস্যার কথা বলে অথবা স্কুলের পরীক্ষায় কোন সমস্যা ধরা পড়ে।
বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। সাত বছরের ওভেন দুই বছর আগে চোখের পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর দেখা যায়, তার বাঁ চোখে ১০০ ডিগ্রি এবং ডান চোখে ৮৫০ ডিগ্রি অদূরদর্শিতা। গত গ্রীষ্মের ছুটিতে তা আরও বেড়ে বাঁ চোখে ১২৫ এবং ডান চোখে ১,০৫০ ডিগ্রি হয়। পরে অদূরদর্শিতা নিয়ন্ত্রণের চশমা, দিনে এক- দুই ঘণ্টায় পর্দার সময় সীমিত করা এবং দৌড়, সাঁতার ও ব্যাডমিন্টনের মতো বাইরের কার্যকলাপ বাড়ানোর পর তার চোখের অবস্থা স্থিতিশীল হয়েছে।



