চীনা কিশোর-কিশোরীরা কেন মাদকে ঝুঁকছে?

পরীক্ষার চাপে নুয়ে পড়ছে চীনের কিশোররা, ঝুঁকছে চেতনানাশক ওষুধের দিকে
পড়াশোনা আর পরীক্ষার চাপে নুয়ে পড়েছে চীনের কিশোর-কিশোরীরা। চাপ কমাতে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে বিপজ্জনক পথ। ঝুঁকছে চেতনানাশক ওষুধের দিকে। অনলাইনে সহজলভ্য হওয়ায় হাতের কাছেই মিলছে এসব ওষুধ। চলছে কেনাবেচা। আবার অনলাইনে ছড়াচ্ছে সেবনের নানা পরামর্শও। এতে শুধু আসক্তিই নয়, বাড়ছে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু অনলাইনে ওষুধ বিক্রি বন্ধ করলেই হবে না, কিশোরদের মানসিক চাপের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও।
চীনের উপকূলীয় একটি প্রদেশের মেধাবী শিক্ষার্থী শিয়াওমেই। তার বয়স ১৪ বছর। পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্তি পেতে তার থেকে বড় এক ছেলের পরামর্শে কাশির ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন শুরু করে সে।
তার কেনা ওষুধটি সাধারণত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যায় না। কিন্তু শিয়াওমেই অনলাইনে ওষুধটি কিনতে সক্ষম হয়। প্রথম দিকে ওষুধ সেবনের পর তার কিছুটা মাথা ঘুরত। পরে পরীক্ষার চাপ থেকে সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার অনুভূতির কারণে সে ধীরে ধীরে এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
এ ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় সেবনে হ্যালুসিনেশন ও শরীরের সমন্বয় ক্ষমতা নষ্ট হওয়ার মতো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
এরপর অনলাইন চ্যাট গ্রুপে অন্যদের পরামর্শে শিয়াওমেই অন্য ওষুধও সেবন শুরু করে। এর মধ্যে কিছু ছিল ব্যথার ওষুধ, আবার কিছু মৃগীরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
কখনো পাঁচটি, কখনো ১০টির বেশি ট্যাবলেট খেত সে। এভাবে প্রায় দুই বছর ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বিভিন্ন প্রেসক্রিপশন ওষুধ সেবন করে শিয়াওমেই। সব ওষুধই সে অনলাইন থেকে কিনেছে।
তার ভাষ্য, ‘পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, পরীক্ষায় খারাপ ফল কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হলেই সে এসব ওষুধ খেত। বাস্তবতা থেকে পালাতেই এমন করত সে।’
বিবিসি জানিয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের চ্যাট গ্রুপে এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেছে আরও বহু চীনা কিশোর-কিশোরী। তাদের প্রায় সবাই একই কারণে এসব ওষুধের দিকে ঝুঁকেছে, আর তা হলো মানসিক চাপ। ওষুধের মাধ্যমে নেশাজাতীয় এক ধরনের অনুভূতি পাওয়ার প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘ফার্মাসিউটিক্যাল হাই’।
সমস্যাটির প্রকৃত পরিধি নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ এ বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান খুবই সীমিত। তবে পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় দুই বছর আগে চীনা সরকার শিয়াওমেইয়ের কাশির ওষুধ দিয়ে পরিসংখ্যান শুরু করেছিল। ওষুধটিকে সাইকোট্রপিক ওষুধ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে। এরপর চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধটি বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
চলতি বছরের এপ্রিলে তরুণদের অন্য একটি ওষুধের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি নজরে আসার পর সেটির প্রেসক্রিপশন ও বিক্রিতেও আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
তবে নিয়ন্ত্রণের পরও অনলাইনে এসব ওষুধের বিকল্প খুঁজে নেওয়ার প্রবণতা আছে। ২০২৫ সালে চীনের বিচার মন্ত্রণালয়ের অপরাধ প্রতিরোধবিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রেও বলা হয়েছে, কোনো একটি ওষুধ নিয়ন্ত্রণ করা হলে তরুণরা দ্রুত অন্য বিকল্প খুঁজে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে শনাক্ত হওয়া এড়াতে ওষুধগুলোর ভিন্ন নামও ব্যবহার করা হয়।
চীনে প্রেসক্রিপশন ওষুধ সহজে পাওয়া যাওয়ার পেছনে দেশটির বিশাল ওষুধশিল্পও একটি কারণ। শিয়াওমেই জানিয়েছে, অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করেই কখনো কখনো ওষুধ কেনা সম্ভব হয়েছে। বয়স জানা থাকা সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে বিক্রেতারা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ওষুধ সরবরাহ করেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৫ বছরের কম বয়সী নতুন শনাক্ত মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪১ শতাংশ কমেছে। কিন্তু একই সময়ে চীনের জাতীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ কমিশন স্বীকার করেছে, প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার একটি ব্যাপক সমস্যা হয়ে উঠছে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এ প্রবণতা বাড়ছে।
শিয়াওমেই জানিয়েছে, তার ক্লাসের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীই প্রেসক্রিপশন ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় সেবনের উপায় নিয়ে আলোচনা করত। তার স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। ফল খারাপ হলে শ্রেণি থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা থাকত। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের ব্যর্থ মনে করত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ত।
চীনা সমাজবিজ্ঞানী ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির পরিচালক শিয়াং বিআওর মতে, এই চাপের একটি বড় অংশ আসে পরিবার থেকে। কয়েক দশক ধরে চলা এক সন্তান নীতির কারণে অনেক পরিবারে একমাত্র সন্তানের ওপর ভবিষ্যতের সব প্রত্যাশা এসে পড়ে। চীনের কিশোরদের দীর্ঘ সময় স্কুলে থাকতে হয় এবং সামাজিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগও তুলনামূলকভাবে কম।
শিয়াং বিআও প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহারের সঙ্গে আত্মক্ষতির প্রবণতারও যোগসূত্র দেখছেন। বিভিন্ন অনলাইন চ্যাট গ্রুপে তরুণদের নিজেদের শরীরে আঘাত করার বিষয়ে একে অন্যকে উৎসাহিত করার ঘটনাও বিবিসির নজরে এসেছে।
গুরুত্বপূর্ণ একটি ভর্তি পরীক্ষা সামনে রেখে শিয়াওমেই উদ্বেগ কমানোর জন্য আরেক ধরনের ওষুধ সেবন শুরু করেছিল। পরে তার স্মৃতিশক্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। সে জানিয়েছে, কিছুই স্পষ্টভাবে মনে রাখতে পারত না এবং সারাক্ষণ ঘোরের মধ্যে থাকত। একপর্যায়ে অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের পর তার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে বাবা-মাকে বিষয়টি জানাতে বাধ্য হয়।
মেয়ের অবস্থা জানার পর তার বাবা-মা তাকে বকাঝকা না করে পাশে দাঁড়ান। শিয়াওমেই জানিয়েছে, বাবা-মায়ের এই পরিবর্তন তার জন্য বড় পার্থক্য তৈরি করেছে।
চীনা সমাজবিজ্ঞানী শিয়াং বিআওর মতে, অনেক শিশু আসলে বেশি মনোযোগ নয়, বরং কেউ তাদের কেমন লাগছে তা জানতে চাইছে, সেটিই চায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার ঠেকাতে শুধু অনলাইন বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না। এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায়ও গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২৩ সালের চীনের ‘মেন্টাল হেলথ ব্লু বুক’-এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, দেশটিতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন এবং তাদের ৩০ শতাংশের বেশি ১৮ বছরের কম বয়সী।
চীনা সরকার কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনার মধ্যে আছে প্রতিটি স্কুলে কাউন্সেলিং কক্ষ, প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা এবং আরও মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে মানসিক সহায়তা ও সংকট মোকাবিলার একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৯২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৯৫ শতাংশ জুনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাউন্সেলর আছে।
তবে শিশু ও কিশোরদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ঘাটতি এখনও বড় সমস্যা। ২০২০ সালে ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, চীনে যোগ্যতাসম্পন্ন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০০ জন। তাদের অনেকেই বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো বড় শহরে কর্মরত।
শিয়াওমেইর পরিবার শেষ পর্যন্ত তার পাশে দাঁড়াতে পেরেছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বাবা-মা তার কথা শুনতে শুরু করেন, তার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। শিয়াওমেইর ভাষ্য, বাবা-মা পাশে আছেন, এই অনুভূতিই তাকে অনেকটা শক্তি দিয়েছে। এমনকি যে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সে এতদিন উদ্বিগ্ন ছিল, সেটিতেও সে ভালো ফল করেছে।
তবে সবার ভাগ্যে এমন পারিবারিক সহায়তা জোটে না। ২২ বছর বয়সী লু জিংচান নিজেও কয়েক বছর বিষণ্নতার সঙ্গে লড়েছেন। প্রেসক্রিপশন ওষুধের নেশাজাতীয় প্রভাব থেকে বের হতে তার কঠিন সময় গেছে। তিনি চার বছরে চারবারের বেশি অতিরিক্ত ওষুধ সেবন করেছিলেন। এখন তিনি সব ধরনের প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার ছেড়ে সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের এ পথ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তার পরামর্শ, জীবনের চাপ সামলাতে ওষুধের মাধ্যমে নিজেকে অসাড় করে না রেখে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
সূত্র: বিবিসি










