ইরান নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আমেরিকাকে চীনের হুঁশিয়ারি
- ‘স্বার্থে আঘাত এলে পাল্টা ব্যবস্থা’

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ এবং চীনের পাল্টা অবস্থান এখন নতুন কূটনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘিরে এবার মুখোমুখি অবস্থানে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি। সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালানো দেশ ও সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক চাপের ঘোষণা দেওয়ার পরের দিন, মঙ্গলবার চীন সতর্ক করে জানিয়েছে, চীনা সংস্থাগুলির বৈধ স্বার্থে আঘাত এলে প্রয়োজনীয় পাল্টা ব্যবস্থা নেবে বেইজিং।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এ দিন নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধান করবে না। বরং এই ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, চীন ইরানের সঙ্গে বৈধ অর্থনৈতিক সহযোগিতা চালিয়ে যাবে এবং তৃতীয় কোনও দেশের চাপ তা বাধাগ্রস্ত করতে পারে না।
ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হল ইরানের অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার ঘোষণা করেন, যেসব দেশ বা সংস্থা ইরানের তেল, আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ককে সহায়তা করবে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ওয়াশিংটনের এই নীতিকে বলা হচ্ছে ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’ অর্থাৎ শুধু ইরানের উপর নয়, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলিকেও শাস্তির আওতায় আনার চেষ্টা।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই চাপের লক্ষ্য হল ইরানের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া আয় কমানো এবং দেশটির সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করা।
কেন চীনকে নিয়ে এত উদ্বেগ?
এই নিষেধাজ্ঞার কেন্দ্রে রয়েছে চীন। কারণ ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বেইজিং। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের কিছু বেসরকারি পরিশোধনাগার ইরানি অপরিশোধিত তেল কিনে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনীতিকে পুরোপুরি চাপে ফেলতে গেলে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তেহরানের তেল রফতানির বড় অংশই চীনা বাজারের সঙ্গে যুক্ত।
তবে বেইজিংয়ের অবস্থান, ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে। তাই ওয়াশিংটনের একতরফা নিষেধাজ্ঞা মেনে নেওয়ার কোনও কারণ নেই বলে জানিয়েছে চীন।
‘নিষেধাজ্ঞা নয়, আলোচনাই সমাধান’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান সংকটের সমাধান অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
লিন জিয়ান বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা ও সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত উত্তেজনা কমানোর দিকে নজর দেওয়া।
ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কেও নতুন চাপ
ইরান ইস্যুতে এই বিরোধ এমন সময়ে সামনে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা আগেই তীব্র।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান নিষেধাজ্ঞা এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংকট নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈশ্বিক প্রভাবের লড়াইয়েরও অংশ হয়ে উঠছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনও চীনের বড় রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনেনি, তবে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
সামনে বড় পরীক্ষা
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ এবং চীনের পাল্টা অবস্থান এখন নতুন কূটনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
একদিকে ওয়াশিংটন চাইছে তেহরানের অর্থনৈতিক পথ বন্ধ করতে, অন্যদিকে বেইজিং নিজের জ্বালানি স্বার্থ ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে।
ইরানের উপর চাপ বাড়াতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ, চীনকে কতটা চাপে রাখা যাবে, আর সেই চাপ বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা নতুন সংঘাত তৈরি করবে।






