ভোটেকোশী থেকে দেবঘাট
নেপালে ১০ ঘণ্টার বিভীষিকা

হিমালয় ভেঙে নেমে আসা হড়পা বানে শুধু কূলই ভাঙেনি ভোটেকোশীর, ভেঙেছে কোল জুড়ে বেড়ে ওঠা সাজানো জনপদও -রয়টার্স
নিস্তব্ধ পাহাড়ের বুক চিরে তখন শুধুই ভোরের আলো ফুটছিল। নেপালের তিব্বত সীমান্তঘেঁষা রসুয়ার শান্ত, স্নিগ্ধ ভোটেকোশী নদীর গায়ে তখনো সেই চিরচেনা আলসেমি! কে জানত, ১৭ হাজার ফুট ওপরের হিমালয়ের হিমবাহের বুকে তখন জমছিল এক মহাপ্রলয়ের বীজ! আচমকা এক আদিম গর্জন, পরপরই আকাশ চিরে নেমে এলো এক কর্দমাক্ত মৃত্যু। শান্ত নদীটি মুহূর্তেই রূপ নিল এক প্রলয়ংকরী জলজল্লাদে। টানা ১০ ঘণ্টার তাণ্ডব! হাহাকার, আর্তনাদ আর দুকূল ভাঙা গর্জন! কাঠমান্ডু পোস্ট।
ঘড়িতে তখন সময় সকাল ৯টা বেজে ৫ মিনিট। নেপালের দ্য সেন্টার অব হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেসের বন্যা পূর্ভাবাস কেন্দ্রে খবর আসে তিব্বতের দিক থেকে একটি বড় ঢল প্রবেশ করেছে ভোটেকোশী নদীতে। মুহূর্তেই সেই ঢল ভোটেকোশী আর ত্রিশূলী নদী হয়ে নারায়ণী নদীতে নেমে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় গোটা নিম্নাঞ্চল। ভাটির দিকে চলার পথে যা যা পেয়েছে— গাড়ি, বাড়ি, এমনকি সেতুও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে এ ঢল।
অবশ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, নদীর পানিপ্রবাহের গতি আর উচ্চতা দেখে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় আগেই বন্যার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকজনকেও দেওয়া হয়েছিল সংকেত।
বন্যার ঠিক আগমুহূর্তে সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এর প্রায় ১৩ মিনিট পর, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে রসুয়ার সায়াব্রোবেসির পানির স্তর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি তথ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। যেখানে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে পানির উচ্চতা ছিল ১ দশমিক ৬২ মিটার (৫.৩ ফুট)। ওই স্টেশনটির সতর্কসীমা ছিল ৬ মিটার (১৯ ফুট), আর বিপৎসীমা ৯ মিটার (প্রায় ৩০ ফুট)। অর্থাৎ, ঢলটি নেপালে প্রবেশের ১৫ মিনিট আগেও পানির উচ্চতা দেখে ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু ১৫ মিনিট পরেই বদলে যায় সেই দৃশ্য। ভোটেকোশী দিয়ে ঢল নামার খবর পেয়েই সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের মধ্যে রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানের নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের উচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার আহ্বান জানিয়ে এসএমএস পাঠায় কর্তৃপক্ষ। ওই সময়ের মধ্যে পাঠানো হয়েছিল ছয় লাখেরও বেশি বার্তা।
এরপর সকাল ৯টা ২০ মিনিটে তথ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয় বেত্রাবতী নদীর পানিস্তর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটিও। সবশেষ সেটি পানির ৩ দশমিক ৫৫ মিটার উচ্চতা রেকর্ড করেছিল। গতিপথ থেকে পূর্বাভাস কেন্দ্র ধারণা করে, সকাল ১০টা ২৮ মিনিটের মধ্যে বন্যাটি ধাদিং-গলছি এলাকায় পৌঁছাবে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুগলিং অতিক্রম করবে। সে অনুযায়ী পৃথ্বী মহাসড়ক, মুগলিং-নারায়ণঘাট সড়ক এবং ত্রিশূলী নদী তীরের মানুষদেরও পাঠানো হয় সতর্কবার্তা।
বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে ফুর্কি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের পানিস্তর বিপৎসীমা পেরিয়ে যায়। এর ঠিক ১৭ মিনিট পর, ঘড়িতে যখন বেলা ১১টা ৪৩ তখন পানির ঢল ভাসিয়ে নিয়ে যায় ফুর্কি নদীর সেতুসহ আশপাশের নানা স্থাপনা। পরবর্তী ৭ মিনিটের মধ্যে বানের পানি গিয়ে পৌঁছে মালেখু এলাকায়।
দুপুর ১টা নাগাদ বন্যাটি মুগলিং পার হয়ে যায়। তার আগেই দেবঘাট পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বার্তা পাঠায় বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র। দুপুর দেড়টায় দেবঘাট পয়েন্টে নদীর পানি বেড়ে ৪ দশমিক ৭৬ মিটারে পৌঁছে। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, মূল বন্যার ঢলটি বেলা সাড়ে ৩টার দিকে দেবঘাটে পৌঁছাতে পারে এবং তখন নদীর পানি বেড়ে প্রায় ৮ মিটার পর্যন্ত উঠতে পারে। দুপুর ২টা ১৪ মিনিটে কালিখোলা পর্যবেক্ষণ স্টেশনের পানির স্তর পেরোয় বিপৎসীমা। তখন সেখানে পানির উচ্চতা পৌঁছে ১২.৩ মিটারে। এর পরের এক ঘণ্টায় ঢল যায় নারায়ণী-দেবঘাট এলাকার দিকে। বেলা ৩টা ২০ মিনিটে সেখানে পৌঁেছ যায় বানের পানি। বিকাল ৪টায় দেবঘাটে নদীর পানি সর্বোচ্চ ছিল ৬ দশমিক ৫৭ মিটারে। এরপর আর বাড়েনি, বরং কমতে শুরু করে। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে দেবঘাটে নদীর পানি কমে নামে প্রায় ৪ মিটারে। প্রাথমিক কারিগরি মূল্যায়ন অনুযায়ী, পুরো বন্যার প্রবাহে যুক্ত হয়েছিল অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার পানি।
সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের ভূমিকম্প থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দেবঘাটে নামতে শুরু করা পর্যন্ত ভোটেকোশী থেকে ত্রিশূলী হয়ে মুগলিং, মালেখু ও দেবঘাট পর্যন্ত ১০ ঘণ্টা পেরিয়েছে বন্যার পানি। প্রতিবেদন বলছে, বন্যা এত আকস্মিক ভাটির দিকে নেমেছে যে, কয়েকটি নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে তথ্যই পাঠানো যায়নি।
চীনের বাঁধেই কি নেপালে বন্যা: তিব্বত থেকে সৃষ্ট নেপালে আকস্মিক বন্যায় বেড়ে চলেছে প্রাণহানির সংখ্যা। গত বুধবার দেশটির নুয়াকোটের ভোটেকোশী নদী এলাকায় হঠাৎ বন্যায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর হয়েছে ব্যাপক ক্ষতি। ভয়াবহ এ দুর্যোগের পর নজরে আসছে বেইজিংয়ের ভূমিকা। গতকাল এনডিটিভির প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চীনের দেওয়া আগাম সতর্কবার্তা নেপালে আঘাত হানা বন্যায় প্রাণহানি রোধে কোনো সহায়তা করতে পারত কি না, সেটি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। এ বিষয়ে চীন তাদের উত্তরে বলেছে, বেইজিং নেপালি পক্ষকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেয়নি। এ কারণে নেপালে প্রাণহানি ঘটেছে, এ দাবিগুলো আসলে মিথ্যা। গতকাল নেপালের চীনা দূতাবাস একটি বিবৃতি প্রকাশ করে নেপালের বাঁধ ধসের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
চীনের কোনো প্রকার আগাম সতর্কতার অভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ড. গোবিন্দ রাজ পোখারেল। তিনি নেপালের জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ার ও ২০১৫ সালের ভূমিকম্প পরবর্তী পুনর্গঠন কর্তৃপক্ষের সাবেক সিইও। সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যা (জিএলওএফ) পর্যবেক্ষণের জন্য চীনের উন্নততর ব্যবস্থা রয়েছে বলে এতদিন তার ধারণা ছিল। তবে প্রকৃত প্রতিস্থিতি আসলে তা নয় বলে তিনি তার এক্সে লেখেন। এনডিটিভিকে তিনি বলেছেন, ‘তারা নেপালি পক্ষকে তথ্যটি জানাতে পারত, কিন্তু তারাও বিষয়টি খেয়াল করতে পারেনি। আমাদের দিকটি ভাটির দিকের এলাকা হলেও পরিস্থিতি ছিল আমাদের প্রত্যাশার বাইরে; কারণ তখন কোনো বৃষ্টিপাত বা অন্য কোনো দুর্যোগ ছিল না। তাই ভাটির এলাকার মানুষ এমন কিছুর আশঙ্কা করেনি। তার মতে, আগাম সতর্কবার্তাগুলো হয় কার্যকর ছিল না, অথবা সেগুলো কাজ করছিল না।
এ বিষয়ে চীন তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ‘ভুল তথ্য। চীনের দিকের ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয়প্রবণ বাঁধটি ধসে পড়ার ফলে নেপালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’ সঠিক তথ্য হচ্ছে, ‘২৬ আগস্ট সকালে নেপাল প্রান্তে একটি ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পের মতো হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। এতে সৃষ্ট বিশাল কাদার স্রোতে জিরং-রসুয়াগড়ি সীমান্ত অঞ্চলের নেপাল ও চীন— উভয় পাশেই ব্যাপক হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে।’ নেপালের করা দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দোষারোপ কোনো কাজে আসে না, সহযোগিতাই জীবন বাঁচায়।’







