সেনাশাসনের গোলকধাঁধায় অদৃশ্য আম-জনতার প্রাণ
সূ চি নয়, নিখোঁজ মিয়ানমারের গণতন্ত্র

অং সান সু চি - সংগৃহীত ছবি
একজন মানুষকে বন্দি করা যায়। একটি কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করা যায়। এমনকি একটি রাজনৈতিক দলকেও ক্ষমতার বাইরে ঠেলে দেওয়া যায়। কিন্তু একজন মানুষ কোথায় আছেন— সেই প্রশ্নটিও কি অদৃশ্য করে দেওয়া সম্ভব? মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর বাতাসে আজ সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। যে শহর একদিন সামরিক শাসকদের কল্পনায় তৈরি হয়েছিল ক্ষমতাকে নিরাপদ রাখার জন্য, সেই শহরেই আজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দেশের সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী, গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের মুখ, সাবেক রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিকে। কোথায় আছেন সু চি— এই প্রশ্নের উত্তর যেন হারিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ মহাসড়ক, নির্জন কম্পাউন্ড, নিরাপত্তাচৌকি আর প্রশাসনিক গোপনীয়তার গোলকধাঁধায়।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে জনসমক্ষে আর দেখা যায়নি অং সান সু চিকে। সামরিক বাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে বন্দি করে। এরপর কেটে গেছে বছরের পর বছর। সম্প্রতি সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং ঘোষণা করেছেন, সু চিকে নেপিদো কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে। ঘোষণাটি তিনি উপস্থাপন করেছেন এক ধরনের ‘দয়া’ বা ‘সহানুভূতির পদক্ষেপ’ হিসেবে, বিশেষ করে বিতর্কিত নির্বাচনের পর নিজেকে সামরিক শাসক থেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট রূপে তুলে ধরার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে।
কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, এতে আসলে কী বদলেছে? ৮১ বছর বয়সী সু চি কি আগের চেয়ে বেশি স্বাধীন? নাকি তিনি শুধু আরেকটি অজ্ঞাতপরিচয় স্থানে, আরেক ধরনের বন্দিত্বে রয়েছেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পৌঁছাতে হয় নেপিদো শহরে— এক অদ্ভুত রাজধানীতে, যার অস্তিত্বই যেন রহস্যকে রক্ষা করার জন্য নির্মিত। প্রায় ১০ লাখ মানুষের এই শহরের আয়তন নিউ ইয়র্ক নগরের প্রায় ৯ গুণ। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে নামহীন কম্পাউন্ড, নিরাপত্তাবেষ্টিত আবাসন, জঙ্গল, ধানক্ষেত এবং প্রায় জনশূন্য বিশাল মহাসড়ক। ২০ লেনের রাস্তা দূরে মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। এমন এক নগর, যেখানে পথ হারানো খুব সহজ আর কাউকে আড়াল করে রাখা আরও সহজ।
সু চির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সামরিকপন্থী ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) নেতা থেইন তুন স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। তার বক্তব্য, সবাই তার (সু চি) অবস্থান জানতে পারে না। আরেক ইউএসডিপি সংসদ সদস্য ও মুখপাত্রকে প্রশ্ন করা হলে তিনি আরও সরাসরি বললেন, ‘আমি জানি না। কারণ আমিও জনগণের একজন।’
এই অজ্ঞতা কি সত্যিই অজ্ঞতা, নাকি একটি সুপরিকল্পিত নীরবতা— তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
নেপিদোকে ২০০৫ সালে রাজধানী ঘোষণা করেছিলেন সাবেক সামরিক শাসক থান শোয়ে। পুরনো রাজধানী ইয়াঙ্গুন এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয় থেকে দূরে, দেশের প্রায় মধ্যভাগে গড়ে তোলা হয়েছিল নতুন এই প্রশাসনিক নগরী। নগরতাত্ত্বিকদের মতে, এর অবস্থান নির্বাচন এবং নকশা— দুটির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল জনবিক্ষোভ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের ভয়। দুই দশকেরও কম সময়ে নির্মিত শহরটি একই সঙ্গে শান্ত এবং অস্বস্তিকর। বিশাল সরকারি ভবন, সুবিশাল সংসদ কমপ্লেক্স, পরিচ্ছন্ন লন, নিখুঁত রাস্তা— সবকিছুর ওপর যেন নজর রাখছে নিরাপত্তাবাহিনী। ৩২৪ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সকে বিশ্বের বৃহত্তম আইনসভা চত্বরগুলোর একটি বলা হয়। অথচ সেই সংসদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে এক ধরনের শূন্যতা। এমনকি স্থানীয়দের অনেকেই বললেন, নেপিদোতে মানুষ কম, নিরাপত্তা বেশি। নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ ও নগর-বিশ্লেষক গ্যালেন পারডি নেপিদো সম্পর্কে একটি স্মরণীয় মন্তব্য করেছেন— এ শহরে বাস করাটাই যেন এক ধরনের গৃহবন্দিত্ব।
গ্যালেন পারডির মতে, একটি ভালো শহরের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকার কথা, নেপিদো তার প্রায় উল্টো।
এই বিভ্রান্তি শুধু সাধারণ মানুষের নয়। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও একই চিত্র দেখা যায়। দুটি পৃথক এলাকার পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, যখন সু চির গৃহবন্দিত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন তাদের বলা হয়েছিল, তিনি এমন একটি এলাকায় আছেন, যেখানে প্রবেশাধিকার তাদেরও নেই। ফলে রহস্য আরও গভীর হয়েছে।
অং সান সু চির জীবনের সঙ্গে গৃহবন্দিত্বের ইতিহাস নতুন নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক অং সানের মেয়ে সু চি দীর্ঘ সময় বিদেশে কাটানোর পর ১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে গণতন্ত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পরে ইয়াঙ্গুনে পারিবারিক বাসভবনে প্রায় ১৫ বছর গৃহবন্দি ছিলেন তিনি। সেই বাড়ি একসময় গণতন্ত্রপন্থীদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল। ১৯৯১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
পরে সামরিক বাহিনী ধীরে ধীরে গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু করলে সু চি ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।
বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করে। অভ্যুত্থানের পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। নেপিদোতে সরকারি দায়িত্বে থাকাকালে যে ভিলাগুলোর একটিতে তিনি বসবাস করতেন, সেটিও এরই মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। নিরাপত্তাচৌকিতে ঘেরা সরকারি আবাসন এলাকায় একজন নির্বাচিত নেতা হিসেবে থাকার অধিকার তার ছিল। কিন্তু এখন তিনি কোথায়— সেই প্রশ্নের উত্তর আরও দুর্লভ। সু চির ছেলে কিম অ্যারিস লন্ডন থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তার মাকে যে স্থানে রাখা হয়েছে, সেটি কোনো আরামদায়ক সরকারি বাসভবন নয়; বরং এক ধরনের ব্যক্তিগত কারাগার। তার কথায়, কয়েক বছরে তার (সু চি) ওপর যা ঘটেছে, তার তুলনায় এখনকার পরিস্থিতি কতটা আলাদা, আমি সত্যিই জানি না।
এদিকে মিন অং হ্লাইংয়ের শাসনাধীন পাঁচ বছরের শাসনপর্বের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সু চির দলকে কার্যত বাইরে রাখা হয়। জানুয়ারির সেই নির্বাচনে সামরিকপন্থী ইউএসডিপি সহজ জয় পায়।
নেপিদোর সংসদ ভবনে এখনো এমন কিছু পুরনো সাময়িকী দেখা যায়, যেখানে সু চির প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতা কাঠামো যেন তাকে ইতিহাসের একটি বন্ধ অধ্যায়ে পরিণত করতে চাইছে।
ইউএসডিপির সংসদ সদস্য আয়ে চান বলেছেন, তিনি (সু চি) মুক্তি পান বা না পান, রাজনীতিতে আর কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন না। বয়সও হয়ে গেছে।
আয়ে চানকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তাহলে সু চি এখন কোথায়? তার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, আমার কোনো ধারণা নেই।
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখন মিয়ানমারের খুব কম মানুষই জানেন। কিন্তু উত্তরহীন এই প্রশ্নটিই যেন বর্তমান মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রূপক। কারণ অং সান সু চি শুধু একজন বন্দি নেত্রী নন। তিনি এমন এক গণতান্ত্রিক স্বপ্নের প্রতীক, যাকে জনসমক্ষ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায়নি। যিনি একসময় লাখো মানুষের আশা হয়ে উঠেছিলেন, তিনি আজ এমন এক শহরের অন্তরালে, যার বিস্তীর্ণ মহাসড়কও যেন তার অবস্থানের দিকে পৌঁছাতে পারে না।




