সুড়ঙ্গের অন্ধকারে কত প্রাণ?
প্রতি সেকেন্ডে ফুরোচ্ছে আশার আলো, নেপালে স্বজনদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে

প্রতিটি ঘণ্টা যেন এক একটি বছর। সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা স্বজনদের কথা ভেবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারগুলির চোখে এখন শুধু আতঙ্ক আর অপেক্ষা। কেউ জানেন না, অন্ধকারের সেই গভীরে তাঁদের প্রিয়জনেরা এখনও বেঁচে আছেন কি না। শুধু একটি আশাই ধরে রেখেছে সবাই, উদ্ধারকারীরা পৌঁছনোর আগ পর্যন্ত তাঁরা হয়তো অপেক্ষা করছেন।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর রসুয়া জেলার আপার ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে চলছে মরিয়া অভিযান। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই সুড়ঙ্গে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রবিবার উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে পৌঁছে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছেন।
তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আটকে থাকা শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, প্রতিটি দেরি তাঁদের আশাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। কারও ভাই, কারও সন্তান, কারও স্বামী–অনেকেই দিনের পর দিন সুড়ঙ্গের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন কোনও খবরের জন্য।
ভাইকে খুঁজতে প্রতিদিন সুড়ঙ্গের মুখে
২০ বছরের শ্রমিক প্রবীণ বুধার ভাই রাম বুধা প্রতিদিন ফিরে আসছেন রসুয়ার সেই সুড়ঙ্গের কাছে। বন্যার পর থেকেই নিখোঁজ ছোট ভাইয়ের কোনও খবর পাননি তিনি।
রাম জানিয়েছেন, তিনি সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত ঢুকেছিলেন। বুকসমান কাদা পেরিয়ে তিনি ভাইয়ের নাম ধরে ডাকলেও কোনও উত্তর পাননি। তবু আশা ছাড়ছেন না। তাঁর কথায়, “আমি শুধু জানতে চাই, ভেতরে কী অবস্থা।”
প্রবীণ সম্প্রতি দ্বাদশ শ্রেণি পাস করেছিলেন। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল তাঁর। সেই সময় কিছু অর্থ উপার্জনের জন্যই দাদার সঙ্গে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
উদ্ধার অভিযানে সেনা ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ
উদ্ধারকাজে নেপালের প্রায় ১০ হাজার সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ দলও সহায়তা করছে। ভারতের ১১ সদস্যের একটি বিশেষ সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল পৌঁছেছে। চীনও পাঁচ জন সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে।
উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সুড়ঙ্গের ভেতরে জমে থাকা কাদা, ধ্বংসাবশেষ এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি। শনিবার উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে শ্রমিকদের খোঁজ চালায়। কিন্তু ঘন কাদা ও বাধার কারণে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর থেকে বিপর্যয়ের শুরু। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে পাহাড়ি এলাকায় বরফ ও পাথর ধসের পর ব্যাপক জলপ্রবাহ নেমে আসে। এতে বহু গ্রাম, সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়েছে।
এই দুর্যোগে নেপালে মৃতের সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে আপার ত্রিশূলি প্রকল্প অন্যতম।
সুড়ঙ্গের ভেতরে কি এখনও জীবন আছে?
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা শ্রমিকদের কাছে হয়তো কিছুটা অক্সিজেন ও পানি পৌঁছনোর সুযোগ থাকতে পারে। তবে তাঁদের প্রকৃত অবস্থান বা শারীরিক পরিস্থিতি এখনও জানা যায়নি।
উদ্ধারকারীরা এখন ক্যামেরা, অক্সিজেন সরঞ্জাম এবং বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুড়ঙ্গের গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া, পাহাড়ি ভূমি এবং ধ্বংসস্তূপের কারণে প্রতিটি পদক্ষেপই কঠিন হয়ে উঠছে।
সুড়ঙ্গের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারগুলির কাছে এখন সময়ই সবচেয়ে বড় শত্রু। তাঁরা জানেন না পরের খবরটি আশার হবে, না কি আরও বড় শোকের। তবু অপেক্ষা থামছে না।
কারণ সুড়ঙ্গের অন্ধকার যত গভীরই হোক, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বজনেরা বিশ্বাস করতে চান ওপারে হয়তো এখনও কেউ অপেক্ষা করছেন তাদের জন্য।







