নকল বিলাসপণ্যের স্বর্গরাজ্য ভিয়েতনাম, ঠেকাতে কী করছে দেশটি

ফরাসি বিলাসবহুল ব্র্যান্ড লুই ভিতোঁর ব্যাগ নকল ডিজাইনার পণ্যের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্যের মধ্যে অন্যতম। ছবি: বিবিসি
চলতি বছরের শুরুতে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির দুটি গুদামে অভিযান চালায় দেশটির পুলিশ। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ২৩ হাজার জোড়ার বেশি নকল জুতা। দাম মাত্র ৩০ ডলার। অথচ এই জুতার আসল একটির দাম ৯০০ ডলার!
যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি চাপ ও সম্ভাব্য শুল্কের মুখে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে ভিয়েতনাম সরকার। কিন্তু থামছে না নকল ব্যবসা। কারণ দামি পণ্যের সস্তা সংস্করণ চায় সাধারণ মানুষ। এই দ্বন্দ্বেই টিকে আছে বিশাল এক কালোবাজার।
এমনই এক জাল সাম্রাজ্যের গল্প তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
ভিয়েতনামের কঠোর অভিযানে বন্ধ হচ্ছে অনেক দোকান, জব্দ হচ্ছে হাজার হাজার জাল পণ্য। তবে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের ধারণা, ক্রেতার চাহিদা থাকলে পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে নকল পণ্যের বাজার।
হো চি মিন সিটির উপকণ্ঠে অভিযানে জব্দ এসব জুতার মধ্যে ছিল নাইকি, অ্যাডিডাস, ক্রক্স ও গুচ্চির লোগো। তবে এগুলোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না ওই ব্র্যান্ডগুলোর। সবগুলোই ছিল নকল পণ্য।
প্রায় ২০০ কোটি ভিয়েতনামি ডং বা প্রায় ৭৬ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের জাল পণ্য জব্দ করা হয় অভিযানে। এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই চলা নকল পণ্যের বাজারের বিরুদ্ধে সরকারের চলমান অভিযানের অংশ।
অভিযানস্থল থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে হো চি মিন সিটির পর্যটন এলাকা। এখানে অবস্থিত একটি বাজারে ৩০ ডলারে বিক্রি হতে দেখা যায় একই ধরনের নকল স্যান্ডেল। অথচ বিদেশে আসল পণ্যের দাম ৯০০ ডলার পর্যন্ত। বাজারজুড়ে আরও রয়েছে শ্যনেল ব্যাগ, প্রাডা টি-শার্ট ও রোলেক্স ঘড়িসহ নানা নামি ব্র্যান্ডের নকল পণ্য।
স্বল্পমূল্যের বিলাসবহুল পণ্যের নকল তৈরির অন্যতম বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে ভিয়েতনামের পরিচিতি বহুদিনের। তবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকায় সেই ভাবমূর্তি বদলাতে এখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির সরকার।
গত ৭ মে সরকার মেধাস্বত্ব (আইপি) লঙ্ঘন, নকল পণ্য উৎপাদন, অনলাইন পাইরেসি ও ট্রেডমার্ক জালিয়াতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু করে।
এর আগেও এ ধরনের অভিযান হয়েছে ভিয়েতনামে। তবে সাম্প্রতিক অভিযানের কঠোরতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
হো চি মিন সিটির জনপ্রিয় সাইগন স্কয়ারে পোশাক বিক্রেতা ছদ্মনামধারী থান ত্রুক বলেছেন, আগে অভিযান হলেও মূলত জব্দ করা হতো দামি ব্যাগ বা স্যুটকেস। কয়েকদিন পর সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যেত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ অভিযানের পেছনে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় ব্যর্থ দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের (ইউএসটিআর) এক প্রতিবেদনে মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার কারণে ভিয়েতনামকে ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিদেশি দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত ১৩ বছরে প্রথমবার কোনো দেশ এ তালিকায় স্থান পায়। একই প্রতিবেদনে ভিয়েতনামকে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের অন্যতম বড় অপরাধী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
নতুন শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় ভিয়েতনাম সরকার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মে মাসে অন্তত ২০ শতাংশ বেশি অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেয়।
এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল সাইগন স্কয়ার ও বেন থান মার্কেট। এই দুই বাজার নকল পণ্যের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
মে মাসের মাঝামাঝি ধারাবাহিক অভিযানে এসব বাজার থেকে জব্দ করা হয় বিপুল পরিমাণ নকল পণ্য। পাশাপাশি জরিমানা করা হয় প্রায় ১৯ হাজার ডলার।
তবে বিক্রেতারা বলছেন, অভিযানের সঙ্গে তারা অনেকটাই অভ্যস্ত। থান ত্রুকের ভাষ্য, পরিদর্শকরা আসার আগেই কেউ একজন সবাইকে সতর্ক করে দেয় বাঁশি বাজিয়ে। এরপর দোকানিরা সামনের অংশ থেকে সরিয়ে ফেলেন নকল পণ্য। অনেক দোকানে এখন ব্র্যান্ডের লোগোযুক্ত পণ্য কম দেখা গেলেও ভেতরে সেগুলোর মজুত রয়েছে।
ভিয়েতনামের অধিকাংশ নকল পণ্য আসে চীন থেকে। সেখানে উৎপাদিত পণ্য ভিয়েতনামের পাইকাররা আমদানি করে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করেন। পাশাপাশি ইউরোপের অনেক বিলাসবহুল ব্র্যান্ডও এশিয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করায় দক্ষ শ্রমিক ও কাঁচামালের একটি অংশ সহজেই চলে যায় নকল পণ্যের বাজারে।
সরকারের দাবি, মে মাসের শেষ তিন সপ্তাহেই ১ হাজার ৪০০টির বেশি মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করেছে তারা।
তবে চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মে মাসের শেষ দিকে ওয়াশিংটন তদন্ত শুরু করে, ভিয়েতনামের আইপি সুরক্ষায় ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা যাচাই করতে।
এরপর ভিয়েতনামও অভিযান আরও জোরদার করে। ১০ জুন থান হোয়া প্রদেশে পুলিশ একটি চক্রের সন্ধান পায়। তারা বুলগারি, কার্তিয়ে, লুই ভিতোঁ ও টিফানি অ্যান্ড কোংয়ের নকল গয়না তৈরি ও বিক্রি করছিল। এ চক্র ১০ হাজারের বেশি নকল গয়না বিক্রি করে প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার ডলার অবৈধ মুনাফা করেছে বলে অভিযোগ।
এরইমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে হো চি মিন সিটি ও হ্যানয়ের অনেক দোকান। অভিযান চলছে বিভিন্ন গুদাম, পোশাকের দোকান ও জুতার শোরুমেও।
তবে এ অভিযান নিয়ে মতভেদ রয়েছে দেশটিতে।
ফ্যাশন উদ্যোক্তা থি নুয়েন মনে করেন, নকল পণ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত ডিজাইনাররা। তার ভাষ্য, ৭৫ ডলার দিয়ে নকল ডিজাইনার পোশাক কিনতে রাজি থাকেন অনেক ক্রেতা। কিন্তু তার তৈরি মানসম্মত পোশাকের জন্য আপত্তি করেন অর্ধেক দাম দিতেও।
তিনি বলেছেন, ভিয়েতনামে দক্ষ দর্জি ও কারুশিল্পীর অভাব নেই। কিন্তু যথাযথ মূল্যায়ন পান না তারা। অনেকেই শেষ পর্যন্ত নকল পণ্য তৈরির কারখানায় কাজ করতে বাধ্য হন। তাই নকল পণ্যের বাজার সংকুচিত হওয়ায় এখন নিজের ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন তিনি।
অন্যদিকে দা নাংয়ের বাসিন্দা হুই নিয়মিত নকল ফুটবল জার্সি ও জুতা কেনেন। তার মতে, বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যতদিন সহজে নকল পণ্য পাওয়া যাবে, ততদিন মানুষ সেগুলোই কিনবে।
ভিয়েতনামের গ্রামে বাস করেন প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ। দেশটিতে গড় মাসিক আয় মাত্র ২২৫ ডলার। ফলে অনেকের কাছে নকল পণ্যই তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিকল্প।
এসকেইএমএ বিজনেস স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক থি থান হুয়ং ট্রান বলেছেন, মানুষ জানে পণ্য নকল। কিন্তু আসল পণ্য কেনার সামর্থ্য না থাকায় তারা এটিকেই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়।
তার মতে, বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের প্রকৃত ক্রেতা ও নকল পণ্যের ক্রেতা ভিন্ন শ্রেণির। তাই নকল পণ্যের কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি খুব বেশি হয় না। কারণ যাদের সামর্থ্য নেই, তারা নকল পণ্য না থাকলেও আসল পণ্য কিনতেন না।
তবে নকল পণ্যের বড় ক্রেতা শুধু স্থানীয়রা নন, বিদেশি পর্যটকরাও। হো চি মিন সিটির অনেক পর্যটনকেন্দ্রিক বাজারে বিদেশিদের কাছেই বেশি নকল পণ্য বিক্রি হয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সরকারি অভিযান নকল পণ্যের বাজারকে পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না। উৎপাদকরা ইতোমধ্যে আইন এড়াতে নতুন কৌশল নিচ্ছেন। যেমন, নাইকির পরিবর্তে মাইকি নাম ব্যবহার করা বা নকশায় সামান্য পরিবর্তন এনে আইনি জটিলতা এড়ানো।
থি থান হুয়ং ট্রানের ভাষ্য, যতদিন ক্রেতার চাহিদা থাকবে, ততদিন কোনো না কোনোভাবে নকল পণ্যের বাজার টিকে থাকবে। সরকারের নিয়ম যতই কঠোর হোক, নতুন পথ খুঁজে নেবেন বিক্রেতারা। কারণ চাহিদা থাকলে সরবরাহও থাকবে।
সূত্র: বিবিসি







