যুদ্ধে ভেঙে পড়েছে মিয়ানমারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চরম সংকটে স্বাস্থ্যকর্মীরা

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় থাকা ক্লিনিকগুলো বারবার বিমান হামলার শিকার হয়েছে
সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২১ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর চিকিৎসক এলে (ছদ্মনাম) জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি নেন। এক সহকর্মী চিকিৎসকের সঙ্গে চাকরি ছেড়ে তিনি জঙ্গলে চলে যান, যাতে গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন। তিনি আনুমানিক ৪৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর একজন, যারা সে সময় যোগ দিয়েছিলেন সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্টে (সিডিএম)।
পাঁচ বছর পরও গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই। যে সহকর্মী চিকিৎসকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন, পরে তাকেই তিনি বিয়ে করেন। তবে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের মূল্য চড়া হিসাবেই দিতে হয়েছে তাকে।
বর্তমানে এলে সংঘাতে বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের জন্য পরিচালিত একটি ক্লিনিকে কাজ করেন। কিন্তু সেখান থেকে পাওয়া আয় নিজের পরিবার চালানোর জন্যই কষ্টে যথেষ্ট হয়। বৃদ্ধ মা–বাবাকে আর্থিক সহায়তা পাঠানো তো দূরের কথা। তিনি জানান, তাদের পাশে দাঁড়াতে না পারাটাই এখন তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।
এলে বললেন, ‘আমরা দেশের জন্য যা সম্ভব ছিল, সব করেছি। কিন্তু নিজেরা এবং নিজেদের পরিবারের জন্য আমরা যেন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি।’
এলের অভিজ্ঞতা মিয়ানমারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর সংঘাত, চিকিৎসাকেন্দ্রে ধারাবাহিক হামলা এবং জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকটে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, শুধু ২০২৫ সালেই স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের ওপর ৭০টি হামলার ঘটনা নিশ্চিতভাবে যাচাই করা হয়েছে। এতে ১৪৮ জন নিহত এবং ১৮৬ জন আহত হয়েছেন। সামরিক বাহিনীর অবরোধের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক, শিরায় প্রয়োগযোগ্য স্যালাইন, ব্যান্ডেজ, ম্যালেরিয়া পরীক্ষার কিট এবং মাতৃস্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে।
এসব সংকটের কারণে কিছু অঞ্চলে আবারও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। পাশাপাশি প্রতিরোধযোগ্য অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবাও।
জাতিসংঘের এই সংস্থার হিসাবে, বর্তমানে মিয়ানমারে ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা ও সুরক্ষা প্রয়োজন।
সংঘাতের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি হয়ে উঠেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইনসিকিউরিটি ইনসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্যসেবার ওপর হামলা বা সেবা কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার প্রায় ২ হাজার ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এতে শত শত স্বাস্থ্যকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন অনেকেই।
চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হামলা পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় থাকা ক্লিনিকগুলো বারবার বিমান হামলার শিকার হয়েছে। অনেক চিকিৎসক ও নার্স দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, আবার অনেকেই বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দিতে।
মা হওয়ার পর যুদ্ধের মানসিক অভিঘাত এলের কাছে আরও গভীর হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, সংঘাতে আহত সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে এখন সেই কষ্ট আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভব করেন।
এলে বললেন, ‘চিকিৎসকেরা মৃত্যু দেখেন। কিন্তু এই যুদ্ধে শিশুদের আহত হতে বা মারা যেতে দেখলে খুব কষ্ট হয়। এখন আমি নিজেও একজন মা। তাই মনে হয়, ওদের জায়গায় আমার নিজের ছেলেও থাকতে পারত।’




